ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বিদ্যুতের দাম যেদিন থেকে ইউনিটপ্রতি বাড়তে পারে যত টাকা

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-আমেরিকা উত্তেজনা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব এবার বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর এবার বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগত অনুমোদনের পর পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানিয়েছে, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর আগামী ২০ ও ২১ মে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে এ প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য কারিগরি কমিটি গঠন করেছে কমিশন।

খুচরা পর্যায়েও বাড়তে পারে দাম

পাইকারি মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে খুচরা পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যবহারভিত্তিক স্তর অনুসারে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা পিজিসিবি সঞ্চালন চার্জ হিসেবে প্রতি ইউনিটে আরও ১৬ পয়সা বাড়ানোর আবেদন করেছে।

তবে সরকার বলছে, লাইফলাইন বা স্বল্প ব্যবহারকারী গ্রাহকদের (৭০ ইউনিট পর্যন্ত) আপাতত এই বাড়তি চাপের বাইরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তারপরও দেশের প্রায় ৫ কোটি গ্রাহকের মধ্যে অন্তত ৩৭ শতাংশ সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবের মধ্যে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ৮ টাকা ৯৫ পয়সা এবং পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা।

কেন বাড়ছে বিদ্যুতের দাম

বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমান বিক্রয়মূল্যের তুলনায় প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি ব্যয় হচ্ছে। এর ফলে ভর্তুকির চাপ বেড়ে চলেছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে আরও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে এ খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। পাশাপাশি অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা খাতটিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

মূল্যস্ফীতির মধ্যে নতুন উদ্বেগ

বর্তমানে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪ শতাংশের কাছাকাছি। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তাঁদের মতে, মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে, যার প্রভাব বাজারে পণ্য ও সেবার দামে পড়তে পারে।

অতীতের মূল্যবৃদ্ধি ও বিতর্ক

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। তখন পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

গত দেড় দশকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। একই সময়ে বিশেষ ক্ষমতা আইন করে দরপত্র ছাড়াই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কারণে সরকারের ওপর বিপুল ক্যাপাসিটি পেমেন্টের চাপ তৈরি হয়। যদিও জ্বালানির ঘাটতির কারণে অনেক সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষমতা আবার বিইআরসির হাতে ফিরিয়ে দেয় এবং খরচ কমানোর উদ্যোগ নেয়। তবে তাতেও ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

জুনেই কার্যকর হতে পারে নতুন দর

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানি ইতোমধ্যে বিইআরসিতে প্রস্তাব পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কমিশন গণশুনানি শেষে নতুন দর ঘোষণা করবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সবকিছু ঠিক থাকলে জুনের শুরু থেকেই নতুন বিদ্যুতের মূল্য কার্যকর হতে পারে।