ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

বাড়ছে যেসব পণ্যের দাম

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রস্তাবিত এ বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্প সুরক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় বিভিন্ন পণ্য ও খাতে শুল্ক, ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে বাজারে বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তামাকজাত পণ্যে বড় কর বৃদ্ধি

প্রস্তাবিত বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কর বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিগারেটের সব স্তরের ন্যূনতম খুচরা মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, নিম্নস্তরের ১০ শলাকার সিগারেট প্যাকেটের ন্যূনতম মূল্য হবে ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরের ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের ২১০ টাকা।

এ ছাড়া নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোব্যাকো এবং অন্যান্য নিকোটিনজাত পণ্যের ওপরও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। নিকোটিন গ্রানুলস ও নিকোটিন পাউচের ওপর ৩৫০ শতাংশ এবং সিগারেট ফিল্টার তৈরির কাঁচামালের ওপর ৩০০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে দেশে উৎপাদিত অ্যালকোহলের ওপর লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশীয় অ্যালকোহলজাত পণ্যের মূল্য বাড়াতে পারে।

গাড়ির দাম বাড়ার আশঙ্কা

মোটরগাড়ি খাতে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব এসেছে। বিশেষ করে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার ডিজেল ও পেট্রোলচালিত গাড়ির মোট করহার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে মধ্যম সারির ব্যক্তিগত গাড়ির বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

কাজুবাদাম ও আমদানিকৃত মাছে কর

আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্যের মধ্যে কাজুবাদামের ওপর বড় ধরনের শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অপ্রক্রিয়াজাত ও প্রক্রিয়াজাত উভয় ধরনের কাজুবাদামের শুল্ক ২৫ শতাংশ নির্ধারণের ফলে বাজারে এ পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

এ ছাড়া উচ্চমূল্যের আমদানিকৃত হিমায়িত মাছের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং পাঙ্গাস মাছের ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের খুচরা মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে।

নির্মাণ খাত ও গৃহস্থালি পণ্যে বাড়তি খরচ

আমদানি করা হাউজহোল্ড ওয়াশিং মেশিনের ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে বিদেশি ব্র্যান্ডের ওয়াশিং মেশিন ক্রয়ে ভোক্তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।

নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতের বিভিন্ন পণ্যের ওপরও কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। এমএস রড ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে কর ও ভ্যাট প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। ফলে নির্মাণ ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া আমদানি করা জিপসাম বোর্ড ও শিটের ওপর ২০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক, কোল্ড-রোল্ড কয়েল ও শিটের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক, কপার তারের ওপর ১০ শতাংশ এবং কপার টিউবের শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব পণ্য বিদ্যুৎ, নির্মাণ ও শিল্প খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।

শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক বৃদ্ধি

দেশীয় শিল্প সুরক্ষার যুক্তিতে বেশ কয়েকটি কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবারে নতুন করে ৫ শতাংশ শুল্ক, পিভিসি ও পিইটি রেজিনে ১০ শতাংশ এবং মেইজ স্টার্চে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।

একই সঙ্গে বাইসাইকেলের ফ্রি হুইলের শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং এক কেভিএ পর্যন্ত ক্ষমতার ট্রান্সফরমারের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ফাস্ট ফুড ও রেস্তোরাঁর খাবার

গ্রিজ প্রুফ পেপার ও গ্লাসিন পেপারের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।

খাদ্য মোড়কজাতকরণে ব্যবহৃত গ্রিজ প্রুফ পেপার মূলত বার্গার, স্যান্ডউইচ, পিজ্জা ও বিভিন্ন ভাজাপোড়া খাবার প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে গ্লাসিন পেপার ব্যবহৃত হয় প্রিমিয়াম ফুড প্যাকেজিং ও বিশেষায়িত মোড়কজাতকরণে। এসব উপকরণের আমদানি ব্যয় বাড়লে রেস্তোরাঁ, ফাস্ট ফুড চেইন ও বেকারি খাতের পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাপর্যায়ে গিয়ে খাবারের দামে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারের দাবি, দেশীয় শিল্প সুরক্ষা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে এসব কর ও শুল্ক পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত কর বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী, যানবাহন এবং খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল্যচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়বে।