রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভবঘুরে জীবনযাপনকারী রাজীব শাহকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা ও বিতর্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায় ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও মসজিদ নির্মাণের কথা বলে মানুষের সহানুভূতি ও ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগালেও রাতের আঁধারে তিনি মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত। যদিও রাজীব শাহ এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তিনি কোনো মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন। তার কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাজীব শাহের গড়ে তোলা ছোট্ট একটি স্থাপনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বাঁশ, টিন, পরিত্যক্ত কাঠ, ইট ও বিভিন্ন ফেলে দেওয়া সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হয়েছে তার বসতঘর। এর পাশে তিনি ঘাস পরিষ্কার করে নামাজের জন্য একটি স্থান তৈরি করেছেন। সেখানে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ইসলামিক বই। নিজের এই ছোট্ট সাম্রাজ্যের নাম দিয়েছেন ‘নবাবপাড়া’। শুধু বসতঘর বা নামাজের স্থান নয়, সেখানে তিনি বাগান করেছেন, ধান চাষ করেছেন এবং বিভিন্ন গাছের চারা লাগিয়েছেন। পাখি ও পশুর জন্যও নানা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি।
তবে এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সামনে এসেছে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে জনপ্রিয়তা ও অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজীব শাহকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে কনটেন্ট নির্মাতা ও ইউটিউবারদের ভিড়। বিভিন্ন ভিডিও ও প্রচারের মাধ্যমে তার কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ-বিদেশ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার কথাও উঠে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ধর্মীয় আবেগকে সামনে রেখে এভাবে মানুষের সহানুভূতি ও অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এমনকি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে সরকারি জায়গায় স্থাপনা তৈরির চেষ্টা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাজীব শাহের দাবি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিনি একটি বড় মসজিদ নির্মাণ করতে চান। তার ভাষ্য, ‘এই জমির মালিক আল্লাহ’, তাই সেখানে মসজিদ নির্মাণে বাধা দেওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে সরকারি জায়গায় অনুমতি ছাড়া স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন আপত্তি জানিয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাকে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য সময়সীমা দেওয়া হলেও তিনি সরে যেতে অস্বীকৃতি জানান। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযানের প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়।
এদিকে রাজীব শাহের পরিচয় নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। কেউ তাকে ভবঘুরে, কেউ টোকাই হিসেবে পরিচয় দিলেও রাজীব নিজেকে বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারান এবং মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বসবাসকারী বিহারি সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে বেড়ে ওঠেন। এ কারণে তার কথাবার্তায় বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষার প্রভাব রয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, একসময় পালিত মা-বাবার সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও পরে তাদের কাছ থেকে বেরিয়ে নগরীর বিভিন্ন স্থানে বসবাস শুরু করেন।
বর্তমানে দিনের বড় একটি সময় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্লাস্টিকের বোতল, ক্যান ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন রাজীব শাহ। ফেলে দেওয়া বাঁশ, টিন, কাঠ, ইট ও প্লাস্টিক দিয়ে তিনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিজের বসতঘর তৈরি করেছেন। তার গড়ে তোলা এই জায়গায় বাগান, ধানক্ষেত, গাছের চারা এবং নামাজের স্থান রয়েছে। নিজের জীবনের স্বপ্ন হিসেবে তিনি একদিন একটি ছোট্ট ‘রাজত্ব’ গড়ে তোলার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন।
তবে রাজীব শাহকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে তার কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য নিয়ে। একদিকে তিনি ধর্মীয় আবেগকে সামনে রেখে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগের কথা বলছেন, অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ উঠেছে মাদককারবারের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা এবং ধর্মীয় আবেগকে কেন্দ্র করে অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সত্যিই একজন ভবঘুরে মানুষের ধর্মীয় ও মানবিক উদ্যোগ, নাকি ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা একটি ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য?
তবে মাদককারবারের অভিযোগ কিংবা ধর্মকে ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ— কোনোটিই এখন পর্যন্ত আইনগতভাবে প্রমাণিত নয়। রাজীব শাহ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রশাসনের তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধান জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে সরকারি জমিতে অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণ, ধর্মীয় আবেগকে কেন্দ্র করে অর্থ সংগ্রহ এবং মাদককারবারের অভিযোগ— সবকিছুই আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে দাবি তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা।

