আগুনে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ)। যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন এক্সিলারেটর কোম্পানির ওই টার্মিনাল ঠিক করতে গত বুধবারই বিদেশ থেকে এসেছেন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা। পরদিন বৃহস্পতিবার আরেক ধাপে আরও বড় মাপের প্রকৌশলীকেও নিয়ে আসা হয়। দেশের প্রকৌশলীদের সঙ্গে নিয়ে তারা দিনরাত চেষ্টা করেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এফএসআরইউটি ঠিক করতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। ঠিক কবে নাগাদ এটি মেরামত করে পুনরায় চালু করা হবে, তা বলতে পারছে না কেউ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুঃখপ্রকাশ ছাড়া পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে আর কোনো বক্তব্য নেই। ফলে গ্যাসের চলমান তীব্র সংকট আরও তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস তথা এলএনজি আমদানির জন্য দেশে দুটি টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনার দায়িত্বে সামিট গ্রুপ। অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির। এ দুই টার্মিনাল এবং দেশীয় উৎস থেকে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও গত মঙ্গলবার থেকে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকা। এর ফলে গত মঙ্গলবার থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের। এতে আবাসিক খাত থেকে শুরু করে দেশের সব খাতে বিরাজ করছে গ্যাসের তীব্র সংকট। চুলায় গ্যাস না থাকায় খাবারের জন্য হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে বেড়েছে ভিড়। শিল্পকারখানাগুলোতে থমকে আছে উৎপাদন। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া পরিবহন খাতেও তৈরি হয়েছে বড় সংকট। মধ্যপ্রাচ্য সংকট কাটিয়ে ওঠার কয়েক দিনের মাথায় আবার গ্যাসের সংকটে বিদেশি বিনিয়োগেও বড় ধাক্কা খেতে যাচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। আর এর অন্যতম কারণ আওয়ামী লীগ সরকার দিনের পর দিন নিজেদের আখের গোছাতে আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত তৈরি করার কারণকে দুষছে সরকার। তবে সংকট কিছুদিনের মধ্যেই কেটে যাবে বলেও আশ্বস্থ করা হয়েছে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে।
টার্মিনাল পরিচালনাকারী রূপান্তরিত গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিএল) একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়ে এসেছে। তারা শুক্রবার একটি ডেটলাইন ঘোষণার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। বলেছিলেন শুক্রবার তারা জানাতে পারবেন কবে নাগাদ চালু করা সম্ভব হবে। তারা পরীক্ষা করে দেখে বলেছেন, বিষয়টি সময়সাপেক্ষ মনে হচ্ছে। আমরা আংশিকভাবে হলেও চালুর আশা করেছিলাম, কিন্তু মনে হয় তা সম্ভব হচ্ছে না। আরও চার-পাঁচ দিন সময় লাগবে বলে মনে হচ্ছে।’
অন্যদিকে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপরেশন অ্যান্ড মাইনন্স) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এক্সিলারেট এনার্জির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা হয়নি। সে কারণে ঠিক কবে নাগাদ চালু করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। আমরা এই মুহূর্তে দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছু বলতে পারছি না গ্রাহকদের কাছে।’
জানা যায়, গত ২১ জুলাই বৈদ্যুতিক শট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। দ্রুত বন্ধ করতে গিয়ে বয়লার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। এ সময় এলএনজি বোঝাই জাহাজ দূরে ছিল বলে কিছুটা রক্ষা হয়েছে। না হলে বিশাল ঝামেলা হতে পারত বলে গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এমপি।
আরপিজিসিএল সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় প্রকৌশলীরা পরীক্ষা করলেও ত্রুটির কারণ শনাক্ত বা সমাধান করা যায়নি। সে কারণে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি বিদেশি বিশেষজ্ঞ এনেছে। এ প্রতিবেদন লেখ পর্যন্ত তারা ত্রুটি খুঁজে বের করতেই অসমর্থ ছিল বলে জানা গেছে।
বর্তমানে প্রতিশ্রুত গ্রাহকের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৫ হাজারর ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার বিপরীতে প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদা বিবেচনায় কমবেশি ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন সরবরাহ দেওয়া হতো। একটি ভাসমান টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে, যে কারণে কয়েক দিন ধরেই গ্যাসের ভয়াবহ সংকট বিরাজ করছে। খোদ রাজধানীর অনেক এলাকায় তিন দিন ধরে গ্যাস মিলছে না দিনের বেলায়। মধ্যরাতে কিছুটা সময়ের জন্য এলেও সকালেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে করে অনেকের বাসায় রান্না বন্ধ হয়ে গেছে, হোটেল থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। লাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হোটেলগুলো বন্ধ থাকায় সংকট বেড়েছে। অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেকে গ্যাস না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানায়ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-১-এর বাসিন্দা আরিয়ান স্টারলিন বলেন, ‘গত বুধবার থেকে রাইস কুকারে কোনোমতে সিদ্ধ ভাত রান্না করে দুই বেলা খাচ্ছি। বাইরে যারা চাকরি করি, তারা রেস্তোরাঁয় টুকটাক খেয়ে আসি, যাতে ঘরে চাপ না পরে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন চললে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষদের দুর্ভোগ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বুঝতে পারছি না।’
একই অভিযোগ করেন রাজধানীর হাতিরপুলের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি একলা মানুষ। দিন শেষে বাসায় ফিরে চুলায় যা হোক কিছু একটা রান্না করে খাই। তবে গত বুধবার থেকে চুলায় বিন্দু পরিমাণ গ্যাস নেই। ফলে অফিস শেষ করে হোটেল-রেস্টুরেন্টেই খেতে হচ্ছে।’
টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি ও মেরামত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এক্সিলারেটের এই টার্মিনালে কয়েক দিন পরপরই দেখা দেয় কারিগরি ত্রুটি। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, এক্সিলারেট এনার্জির শিডিউল রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য প্রতি বছর দেড় মাস এবং সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আরও ১৫ দিন, মোট দুই মাস এলএনজি সরবরাহের বাইরে থাকে। এ সময় একটি টার্মিনাল দিয়ে ৫০ থেকে ৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যায়। এ সময়টা দেশে গ্যাসের সংকট থাকে। কিন্তু সম্প্রতি একাধিকবার টার্মিনালটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় দেশে গ্যাসের সংকট লেগেই থাকছে। এর আগে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ১৫ দিন বন্ধ থাকে টার্মিনালটি। পরে ত্রুটি সারিয়ে উৎপাদনে ফিরলেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে প্রায় এক মাস লেগে যায়।
এবারের সংকট যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে শিল্পকারখানাগুলো পথে বসে যাবে দাবি করে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশের গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে এসব কারখানার উৎপাদন নেমে এসেছে ২৫ থেকে ৩০ ভাগে। সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে রপ্তানিমুখী কারখানার কার্যাদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
গাজীপুরে ৫ হাজারের বেশি কলকারখানা রয়েছে, যার বেশির ভাগই গ্যাসনির্ভর। সম্প্রতি প্রয়োজনের তুলনায় গড়ে ১ লাখ ৪ হাজার ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে বলে জানিয়েছে তিতাস কর্তৃপক্ষ। এতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দিনের বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকছে গ্যাসভিত্তিক কারখানা। উৎপাদন নেমে এসেছে ৩০ ভাগে। একই অবস্থা নারায়ণগঞ্জেও। গত দুই দিনে শিল্পকারখানার উৎপাদন পাঁচ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংকটের গভীরতা সম্পর্কে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, সাভারের ডিইপিজেডের গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোতেও ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক উৎপাদন।
এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় দেশীয় কূপগুলোতে খনন কার্যক্রম জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, একসময় দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২ হাজার ৮০০ মিলিয়নের মতো গ্যাস উৎপাদন হলেও এখন ১ হাজার ৬৪৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। মজুত কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত কমে আসছে উৎপাদন। ঘাটতি সামাল দিতে ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করা হয়। এ জন্য দুটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। বাড়ন্ত চাহিদার বিপরীতে কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন। চাইলেও শিগগির আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। আমদানি বাড়াতে হলে নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে, যা খুবই সময় সাপেক্ষ। এ কারণে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে গ্যাসের সংকট আরও প্রকট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘কাতার এলএনজি পাঠানো অর্ধেক করে ফেলেছে। তাদের এলএনজি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও চীন নিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে কাতার থেকে এলএনজি পাওয়াটা বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে। এগুলো নতুন নয়, তবু আমাদের শিক্ষা হয় না। আমদানির দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। আর দুর্ভোগ পোহাতে হয় গ্রাহকদের। কমে যায় শিল্পোৎপাদন। এর থেকে বের হয়ে দেশীয় উৎপাদনে সরকারকে বেশি করে মনোনিবেশ করতে হবে। সক্ষমতা বাড়াতে হবে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের। তবেই দীর্ঘমেয়াদে আর এমন সংকট তৈরি হবে না।’

