ঢাকা রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

আইনের ‘ফাঁদে’ সাহাবুদ্দিন

রুবেল রহমান
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

জয় বাংলায় শুরু, জিন্দাবাদে শেষ বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর অধ্যায়। রাজনৈতিক অঙ্গন ও নেটপাড়ায় চাউর হওয়া সব গুঞ্জনের চূড়ান্ত যবনিকাপাত হয় শুক্রবার বিকেলে। এদিন স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে স্পিকারের কাছে পাঠান দীর্ঘ পদত্যাগপত্র। এর মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের যে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল। বর্তমানে সাংবিধানিক নিয়মানুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। এদিকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে, পদত্যাগের পর তিনি কি আইনি ও ফৌজদারি সুরক্ষা পাবেন? একই সঙ্গে দেশের পরবর্তী ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে জোর জল্পনা-কল্পনা।

নাটকীয়তা থেকে পদত্যাগ : ২০২৩ সালের এপ্রিলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত থাকলেও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক অভ্যুত্থান দেশের সার্বিক দৃশ্যপট বদলে দেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বঙ্গভবনের গদিনশিন রাষ্ট্রপ্রধানের পদত্যাগ দাবি করে নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। তবে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার স্বার্থে তাকে স্বপদে বহাল রাখা হয়। পদত্যাগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, এটি তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির গোপন যোগাযোগের খবর প্রকাশ পাওয়ার পরই তার অপসারণ বা পদত্যাগের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। একসময়ের ‘চুপপু’ ডাকনামের অবসান ঘটিয়ে বঙ্গভবনে হিরোইজম দেখালেও, শেষ পর্যন্ত পদত্যাগেই তার পদকালের সমাপ্তি ঘটল। যদিও বিরল সৌভাগ্যের প্রতীক তিনি, পরপর তিন সরকারকে শপথ পড়িয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৬ সালে ক্ষমতাসীন বিএনপি, ২০২৪ এ বিপ্লবের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এবং একই বছর পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শপথ পড়ান দেশের ২২তম এই রাষ্ট্রপতি। 

পদত্যাগের পর কি মিলবে সাংবিধানিক সুরক্ষা : রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর তিনি আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন কি না- এ নিয়ে এখন মূল ধারার আইনি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সংবিধান বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির যে দায়মুক্তির কথা বলা আছে, তা কেবল তার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের জন্য প্রযোজ্য।

সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ কি বলে : সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতিকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে একাধিক ফোনালাপে তাকে বলতে শোনা যায়, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে কি লেখা আছে তা পরার পরামর্শ দেন মো. সাহাবুদ্দিন। ৫১ (১) বলা আছে, রাষ্ট্রপতি তার কার্যভার পালনকালে সম্পাদিত কোনো কাজের জন্য কোনো আদালতের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন না। ৫১ (২) এ বলা আছে, রাষ্ট্রপতির কার্যকালে তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের বা অব্যাহত রাখা যাবে না এবং তাকে গ্রেপ্তার বা আটক করার নির্দেশ দেওয়া যাবে না। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, ৫১ অনুচ্ছেদের এই প্রাক-শর্ত কেবল তিনি পদে আসীন থাকা পর্যন্ত কার্যকর থাকে। পদত্যাগের পর এই সুরক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পদত্যাগ-পরবর্তী বিচারের কথা স্মরণ করছেন অনেকে, যেখানে পদত্যাগের পর তাকেও কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছিল।

সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো ফৌজদারি মামলা দায়েরের আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তার পদত্যাগের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল থেকে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আইনি পদক্ষেপের দাবি উঠেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে ১৪০০ ছাত্র-জনতার প্রাণহানির দায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্থানে থেকে সে এড়াতে পারে না বলেই মনে করেন জুলাই যোদ্ধারা। ইতোমধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ এনসিপি নেতারা তার গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন। এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে জুলাই হত্যা মামলা করা হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তিনি প্রকৃত অপরাধী কি না- নির্ধারণ করবেন আদালত। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনকালের বাইরে তার বিচার হতে পারে। রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ায় ফৌজদারি অপরাধের বিচারে ৫১ অনুচ্ছেদে সুরক্ষা পাবেন না সাহাবুদ্দিন, চাইলে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সময় নির্লিপ্ত থেকে সম্মতি প্রদানের অপরাধে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনও তাকে বিচারের কাঠগড়ায় আনতে পারে। ফৌজদারি অভিযোগে বিচারে বাধা নেই, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে ৫১ অনুচ্ছেদ সুরক্ষা দিবে না, এটা শুধু রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপালনকালে সুরক্ষা।

২৩তম রাষ্ট্রপতির দৌড়ে এগিয়ে যারা : মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। জাতীয় সংসদে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীই যে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন, তা স্পষ্ট। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে একাধিক প্রার্থীর নাম নিয়ে শুরু হয়েছে প্রবল সমীকরণ।

রাজনীতিবিদদের অগ্রাধিকারে মির্জা ফখরুল এগিয়ে : বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্র থেকে জানা গেছে, কোনো অলংকারিক বা বাইরের ব্যক্তিত্ব না এনে দলীয় কোনো ত্যাগী ও গ্রহণযোগ্য প্রবীণ রাজনীতিবিদকেই বঙ্গভবনে পাঠাতে চায় বিএনপি। এই তালিকায় সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠে এসেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম। গত ১৫ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মির্জা ফখরুলের অবদান, তার শালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সর্বজনগ্রাহ্যতা তাকে শীর্ষ বিবেচনায় রেখেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলসহ অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ করে লিখেছেন, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপ্রধান পদের জন্য অন্যতম সেরা প্রার্থী। এ ছাড়াও বিএনপির প্রবীণ নেতাদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খানসহ আরও কয়েকজন আছেন আলোচনায়। এ ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নামও আছে আলোচনায়। একই সাথে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘদিন ত্যাগ স্বীকার করা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নামও আলোচনায় আনছেন দলের একাংশের নেতাকর্মীরা। তবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমকেও স্থায়ী রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি কে হবেন তার সুরাহা হতে পারে বলে জানা গেছে। 

জোড় আলোচনায় থাকা নিয়ে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সাথে কথা হয় রূপালী বাংলাদেশের। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নই। রাষ্ট্রপতির পদ খালি হলে অনেকের নাম আলোচনায় আসাই স্বাভাবিক। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলীয় হাইকমান্ড ও জাতীয় সংসদের ওপরই নির্ভর করে। শুনেছি, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে কে হবেন রাষ্ট্রপতি। 

প্রথম নারী রাষ্ট্রপতির সম্ভাবনা: রাজনীতি ও মানবাধিকার অঙ্গন থেকে কয়েকজন নারী ব্যক্তিত্বের নাম আসায় এবার ‘প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি’ পাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকেরা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক মহাসচিব ও বর্তমানে জাতিসংঘে কর্মরত বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী আইরিন খানের নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিনী ডা. জোবাইদা রহমানের নামও কোনো কোনো মহলে গুঞ্জন হিসেবে ঘুরছে। এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ নারী সদস্য সেলিমা রহমানের নামও বিবেচনায় রয়েছে।

বঙ্গভবনের পরবর্তী পদক্ষেপ: সংবিধান অনুযায়ী বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। খুব শীঘ্রই জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিনক্ষণ ও তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে। আজ রোববার সন্ধ্যার দিকে বঙ্গভবনে উঠতে পারেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম। আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের মতে, রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রতি মুহূর্তেই পরিবর্তনশীল। রাষ্ট্রপতির পদটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে দলটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সব মিলিয়ে, মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের মাধ্যমে যেমন একটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে, তেমনই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা কে হচ্ছেন, তা দেখতে মুখিয়ে আছে গোটা দেশ।