ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

হাদি হত্যা ও পরবর্তী প্রেক্ষাপট : সেনাবাহিনী ও নির্বাচন নিয়ে গুজব-ষড়যন্ত্র

আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২, ২০২৬, ০৯:১০ পিএম
শরীফ ওসমান হাদি। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

জুলাই যোদ্ধা ও সময়ের সাহসী কণ্ঠ শরিফ ওসমান হাদির নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধীরে ধীরে বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকে কেন্দ্র করে ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে, যার লক্ষ্য একদিকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল, অন্যদিকে বহুল প্রতীক্ষিত ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যাহত করা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী—বিশেষ করে সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে অসার ও ভিত্তিহীন গুজব ও কল্পকাহিনি ছড়ানো হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে আমি মনে করি।

ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। নিয়মিত ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে মামলার অগ্রগতি, সন্দেহভাজনদের পরিচয়, গ্রেপ্তার ও অভিযুক্তদের অবস্থান সম্পর্কে গণমাধ্যমকে অবহিত করছে। তা সত্ত্বেও একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তথ্যকে বিকৃত করে, অসম্পূর্ণ সূত্রকে ‘চূড়ান্ত সত্য’ হিসেবে উপস্থাপন করে জনমনে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বীজ বপন করছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ নতুন কিছু নয়। তবে ওসমান হাদি হত্যাকে কেন্দ্র করে যে গুজবের রাজনীতি তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্টতই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর একটি ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়। নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা বাহিনীকে বিতর্কিত করা গেলে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, অস্থিরতা বাড়বে এবং নির্বাচন নিয়ে আস্থাহীনতা তৈরি হবে। ফলে ন্যায়বিচারের দাবিকে আড়াল করে সেনাবাহিনীকে টার্গেট করা হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি।

এখানে গুজব ও বাস্তবতার কয়েকটি চিত্র তুলে ধরছি।

সামাজিক মাধ্যমের গুজব

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া ধারাবাহিক গুজব ও ষড়যন্ত্রের সাম্প্রতিকতম একটি উদাহরণ হলো—ওসমান হাদি হত্যা মামলার অভিযুক্ত ফয়সালের মোবাইল লোকেশন নাকি ডিওএইচএস (DOHS) এলাকার একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের বাসায় পাওয়া গেছে। প্রথম দৃষ্টিতেই এই দাবিটি চাঞ্চল্যকর ও উসকানিমূলক।

তবে প্রেক্ষাপট ও উৎস পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই তথ্যটি যে ফেসবুক পেজ থেকে প্রচার করা হয়েছে, সেটি প্রবাসী ইউটিউবার ইলিয়াস হোসেনের ভেরিফায়েড অফিসিয়াল পেজ নয়। অর্থাৎ উৎসটিই ভুয়া, অননুমোদিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। বিশ্বাসযোগ্য উৎসের অভাবে এমন দাবি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; বরং এটি পরিকল্পিত গুজব ছড়ানোর ভয়ংকর ষড়যন্ত্র বলেই প্রতীয়মান হয়।

কারিগরি বাস্তবতা : CDR দিয়ে ‘বাসা’ শনাক্ত অসম্ভব

ডিজিটাল ফরেনসিক ও টেলিকমিউনিকেশন প্রটোকলের আলোকে এই দাবির কারিগরি দিক বিশ্লেষণ করলে বিভ্রান্তির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।

সেল টাওয়ারের বিশাল পরিধি (Cell-ID Coverage):

একটি মোবাইল টাওয়ার বা BTS সাধারণত একটি বৃহৎ এলাকাজুড়ে সিগন্যাল দেয়। শহরাঞ্চলে এর কভারেজ ৩০০ মিটার থেকে ১ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ডিওএইচএস-এর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি টাওয়ারের আওতায় শত শত ভবন ও হাজার হাজার ফ্ল্যাট পড়ে। CDR কেবল নিশ্চিত করে যে ব্যবহারকারী ওই টাওয়ারের সীমানার ভেতরে ছিলেন; কিন্তু কোন বাড়ির কোন কক্ষে ছিলেন, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

বাসা বনাম সাধারণ এলাকা (Location vs Address):

CDR কোনো GPS কো-অর্ডিনেট বা অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ দেয় না। এটি কেবল Location Area Code (LAC) ও Cell ID প্রদান করে, যা প্রযুক্তিগতভাবে একটি বড় বৃত্ত নির্দেশ করে। এই বৃত্তের ভেতরে থাকা সকল নাগরিক একইভাবে অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং নির্দিষ্ট একটি বাসার নাম উল্লেখ করা অনুমাননির্ভর ও কারিগরিভাবে সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ।

সিগন্যাল ওভারল্যাপিং ও প্রতিফলন:

শহরের ভবনঘন এলাকায় সিগন্যাল প্রায়ই প্রতিফলিত হয়। ফলে একজন ব্যবহারকারী এক ভবনে থেকেও পাশের অন্য টাওয়ারের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারেন। এই জটিলতার কারণে CDR দিয়ে সুনির্দিষ্ট ঘর বা বাসা শনাক্ত করা আইনত ও বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

ডিজিটাল ফরেনসিকের মানদণ্ড অনুযায়ী সঠিক অবস্থান জানতে হলে হ্যান্ডসেটের ফিজিক্যাল GPS লগ বা লাইভ ট্র্যাকিং প্রয়োজন হয়, যা সাধারণ কল রেকর্ডে থাকে না। অতএব, ডিওএইচএস-এর একটি নির্দিষ্ট বাসায় অবস্থান পাওয়ার দাবি প্রযুক্তিগতভাবে অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর।

এখানে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একটি সঙ্গবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু একটি বাহিনী নয়; এটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। এই বাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কে টেনে আনা বা গুজবের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ করা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে।

উল্লেখ্য, পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে সঙ্গবদ্ধভাবে সেনাবাহিনী ও মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। কিছু ইউটিউবার—বিশেষ করে পিনাকী ভট্টাচার্য ও ইলিয়াস হোসেন অব্যাহতভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী নিয়ে ভয়ংকর গুজব ও চরম মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে যাচ্ছেন।

এখানে সরকারকে বলতে চাই, অবিলম্বে তাদের জাতীয় শত্রু ঘোষণা করুন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী এই চক্রকে আইনের আওতায় আনুন।

আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, যখনই রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক স্তম্ভগুলোতে আঘাত এসেছে, তখনই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ওসমান হাদি হত্যার বিচার প্রশ্নে সেনাবাহিনীকে জড়ানোর অপচেষ্টা সেই বিপজ্জনক পথেরই ইঙ্গিত দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রচার করলে গুজব আরও শক্তিশালী হয়। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। অজানা ফেসবুক পোস্ট বা অনির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই না করে বিশ্বাস না করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে লাইক, শেয়ার ও মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ওসমান হাদি হত্যার ন্যায়বিচারের দাবি অবশ্যই জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে, কিন্তু তা যেন রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার না হয় সেদিকে আমাদের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

শেষ কথা

ওসমান হাদি হত্যার বিচার সরকারের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। সেই বিচার স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত হওয়াই প্রতিটি নাগরিকের প্রত্যাশা। কিন্তু এই ন্যায়বিচারের পথকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে যদি কেউ নির্বাচন বানচাল বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে, তবে তা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

গুজব ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সঠিক তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতাই একমাত্র প্রতিষেধক। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব হলো এই সত্যকে রক্ষা করা—যাতে ওসমান হাদি হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ১২ই ফেব্রুয়ারির বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন হয়।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা

ahabibhme@gmail.com