একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। শিক্ষা, সৃজনশীলতা, কর্মক্ষমতা ও নৈতিক শক্তির সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী জাতি। কিন্তু আজ সেই তরুণ প্রজন্মই ভয়াবহ এক সামাজিক ব্যাধির শিকার—মাদক। নীরবে, ধীরে ধীরে মাদক গ্রাস করছে দেশের অগণিত তরুণকে, বিপর্যস্ত করছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামোকে। এই সংকট আর কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন জাতীয় উদ্বেগের বিষয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল থেকে শুরু করে নানা ধরনের সিনথেটিক ড্রাগ খুব সহজেই তরুণদের নাগালে চলে এসেছে। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে শহরের অভিজাত পাড়া—কোথাও মাদক চক্রের তৎপরতা কম নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা এমনকি অনলাইন প্ল্যাটফর্মও আজ মাদক ব্যবসার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ফাঁদে সবচেয়ে বেশি পড়ছে কিশোর ও যুবসমাজ।
মাদকাসক্তির পেছনে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। বেকারত্ব, হতাশা, পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সহজে টাকা পাওয়ার লোভ তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৌতূহল বা বন্ধুদের প্রভাবে শুরু হলেও একসময় তা ভয়াবহ আসক্তিতে পরিণত হয়। দুর্বল পারিবারিক নজরদারি এবং সচেতনতার অভাবও এ সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।
মাদকের প্রভাব তরুণদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক। মাদকাসক্ত তরুণ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে কর্মক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। নানা জটিল রোগ, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও আত্মহত্যাপ্রবণতা বাড়ে। একটি সম্ভাবনাময় জীবন পরিণত হয় অসহায় ও বিপর্যস্ত বাস্তবতায়। এর সঙ্গে সঙ্গে পরিবারেও নেমে আসে অশান্তি—অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক লজ্জা ও মানসিক যন্ত্রণা পরিবারকে ভেঙে দেয়।
মাদকাসক্ত তরুণ প্রজন্মের কারণে সমাজেও বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এমনকি খুনের মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে মাদকাসক্তির যোগসূত্র নতুন নয়। অনেক তরুণ মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজই অনিরাপদ হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও মাদকের ক্ষতি ব্যাপক। একদিকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে বাড়তি ব্যয়, অন্যদিকে কর্মক্ষম জনশক্তি হারানোর ফলে অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যে তরুণরা দেশের শিল্প, প্রযুক্তি ও সেবাখাতে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল, তারা আজ মাদকের নেশায় দিকভ্রান্ত। দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সরকার মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে শুধু অভিযান বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মাদক নির্মূলের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। পরিবারকে হতে হবে প্রথম প্রতিরোধক শক্তি। সন্তানের প্রতি নজরদারি, সময় দেওয়া ও মানসিক সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ালে তারা ইতিবাচক পথে যুক্ত থাকবে। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের জন্য সহজলভ্য ও কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে তারা সমাজে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।
মাদকের ছোবলে বিপর্যস্ত তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। এই লড়াইয়ে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। এখনই যদি কার্যকর ও মানবিক উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে আগামী দিনে এর মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে। সময় এসেছে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি সচেতনতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনার।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

-20260103222232.webp)

