ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

রোহিঙ্গা সংকট : টেকসই প্রত্যাবাসনই একমাত্র মুক্তির উপায়

রায়হানুল ইসলাম
প্রকাশিত: মার্চ ২, ২০২৬, ১০:০৬ পিএম
ছবি- সংগৃহীত

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা ও সামরিক অভিযানের পর যে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল, তার অভিঘাত আজও বহন করছে বাংলাদেশ। সীমান্ত পেরিয়ে প্রাণ বাঁচাতে আসা লাখো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কিন্তু প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও এই সংকটের স্থায়ী সমাধান অধরাই রয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠছে—আর কতদিন এই বোঝা বহন করবে বাংলাদেশ? স্পষ্ট হয়ে গেছে, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের প্রকৃত মুক্তি নেই।

রোহিঙ্গা সংকটের মূল শিকড় নিহিত মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতিতে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন রোহিঙ্গাদের জাতিগত স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করে, কার্যত তাদের রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত করে। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে তাদের জীবন হয়ে ওঠে অনিশ্চিত ও নিরাপত্তাহীন। ২০১৭ সালের দমন-পীড়ন ছিল সেই দীর্ঘ বৈষম্যের চূড়ান্ত রূপ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও বাস্তবে রাখাইনে এখনো নিরাপদ ও আস্থাশীল পরিবেশ গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে গড়ে ওঠা শরণার্থী শিবিরগুলো আজ বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী আবাসস্থল। শুরুতে আন্তর্জাতিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক মনোযোগ অন্য সংকটে সরে গেছে। ফলে তহবিল কমছে, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় চাপ বাড়ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব পড়ছে—কর্মসংস্থানে প্রতিযোগিতা, পরিবেশের অবক্ষয়, বন উজাড় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি উদ্‌বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। এই বাস্তবতায় শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি দীর্ঘদিন সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।

প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ একাধিকবার নেওয়া হলেও তা ভেস্তে গেছে আস্থাহীনতার কারণে। রোহিঙ্গারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে তারা ফিরতে চান না। তাদের এই অবস্থান অযৌক্তিক নয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, সুরক্ষার নিশ্চয়তা ছাড়া ফেরত যাওয়া মানে আবারও নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়া। সুতরাং টেকসই প্রত্যাবাসনের প্রথম শর্ত হলো, নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রত্যাবাসন হতে হবে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং প্রত্যাবাসনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

এখানেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কূটনৈতিক চাপ, মানবাধিকার তদন্ত এবং প্রয়োজনে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—সবকিছুর সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মিয়ানমারের নীতিতে পরিবর্তন আনা কঠিন। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে এই সংকটকে কেবল মানবিক সমস্যা হিসেবে নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকট সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান ও উগ্রবাদী তৎপরতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে—যার প্রভাব গোটা অঞ্চলে পড়তে বাধ্য।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি বহুপাক্ষিক ফোরামে সক্রিয় কূটনীতি চালাতে হবে। আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তদারকি জোরদার করা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ত রাখা জরুরি। একই সঙ্গে শরণার্থী শিবিরে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানেও হতাশা ও অপরাধপ্রবণতা না বাড়ে।

তবে বাস্তবতা হলো—প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। দেশটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও সামরিক প্রভাবের কারণে এই সদিচ্ছা এখনো দৃশ্যমান নয়। আন্তর্জাতিক চাপ যতদিন কার্যকর ও সমন্বিত না হবে, ততদিন অগ্রগতি সীমিত থাকবে। তাই বিশ্ব সম্প্রদায়কে দ্বৈত মানদণ্ড পরিহার করে মানবাধিকার প্রশ্নে একক ও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের সৃষ্টি নয়, কিন্তু এর দায়ভার বহন করছে বাংলাদেশ। মানবিকতার স্বার্থে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে, কিন্তু স্থায়ীভাবে এই বোঝা বহন করা কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব নয়। উন্নয়নশীল অর্থনীতি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক চ্যালেঞ্জের মাঝেও বাংলাদেশ যে দায়িত্ব পালন করছে, তা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। এখন প্রয়োজন সেই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার।

সবশেষে বলা যায়, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শরণার্থী শিবিরে সীমাবদ্ধ নয়; এর সমাধান নিহিত রাখাইনের মাটিতে। নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং মানবিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া প্রত্যাবাসন অর্থহীন। টেকসই প্রত্যাবাসনই একমাত্র বাস্তবসম্মত ও ন্যায়ভিত্তিক পথ। মানবিক সহায়তা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী মুক্তি দিতে পারে না। সময় এসেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, আঞ্চলিক শক্তি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসার। অন্যথায় রোহিঙ্গা সংকট শুধু একটি মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবেই নয়, আঞ্চলিক অস্থিরতার দীর্ঘ ছায়া হয়ে থেকে যাবে।