ঈদ সামনে এলেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে একটি পুরোনো উদ্বেগ ফিরে আসে—শ্রমিকরা কি সময়মতো বেতন ও বোনাস পাবেন? প্রতি বছর একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে, আর সেই প্রশ্নের উত্তর অনিশ্চিত হলে শিল্পাঞ্চলে তৈরি হয় উত্তেজনা, বিক্ষোভ এবং অস্থিরতার আশঙ্কা। অথচ এই শ্রমিকদের ঘামেই দাঁড়িয়ে আছে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প কেবল একটি শিল্পখাত নয়; বরং এটি দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় অংশ আসে এই খাত থেকে, এবং কয়েক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে যুক্ত।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—প্রায় প্রতি বছর ঈদের আগে বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শ্রমিকরা উদ্বেগে থাকেন, আর শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ে। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (BGMEA)-এর হিসাব অনুযায়ী, ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ করতে প্রয়োজন হয় প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা ক্রয়াদেশের ওঠানামার কারণে অনেক কারখানা মালিক ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু ঋণনির্ভর এই ব্যবস্থা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এটি প্রতি বছর একই সংকটকে সামনে নিয়ে আসে।
অথচ বিশ্বে অন্যান্য পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। ভিয়েতনামে শ্রমিকদের বেতন ও উৎসবকালীন বোনাস প্রদানের জন্য স্পষ্ট আইনগত কাঠামো এবং শিল্পচুক্তি রয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান আগেই উৎসবকালীন বোনাসের জন্য তহবিল সংরক্ষণ করে। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয় এবং শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা কম থাকে।
ভারতের গুজরাট, মহারাষ্ট্র এবং তামিলনাড়ুর শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব বোনাস নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই প্রদান করা হয়। শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের লাভের ভিত্তিতে শ্রমিকরা বোনাস পান এবং শ্রমিক সংগঠন সক্রিয়ভাবে মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে বিলম্বের সম্ভাবনা কমিয়ে আনে।
শ্রীলঙ্কার পোশাক শিল্পেও উৎসবকালীন অর্থপ্রদানের নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আগেই এই অর্থের জন্য তহবিল গঠন করে রাখে। ফলে শ্রমিকদের জীবনমান যেমন সুরক্ষিত থাকে, তেমনি শিল্পের উৎপাদনশীলতাও বজায় থাকে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে—পরিকল্পিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা থাকলে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার কথা নয়। শ্রমিকদের সমস্যাটি কেবল অর্থের নয়; এটি গভীরভাবে মানবিক। ঈদ মানে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি, নতুন পোশাক, গ্রামে যাওয়া এবং সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু বেতন বিলম্বিত হলে সেই আনন্দ দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়। অনেক শ্রমিক তখন বাড়ি ফেরার ভাড়া, সন্তানের পোশাক কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ে চিন্তায় পড়েন। এই হতাশা জমতে জমতে একসময় ক্ষোভে রূপ নেয়—যার ফল হয় শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা।
এখানেই রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন হলে স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা বা নীতিসহায়তা দিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে শিল্পে আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি। বছরের শুরু থেকেই উৎসবকালীন বেতন ও বোনাসের জন্য তহবিল গঠন করা গেলে এই সংকটের পুনরাবৃত্তি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
গার্মেন্টস মালিকদেরও মনে রাখতে হবে—এই শিল্পের সাফল্যের ভিত্তি শ্রমিকের শ্রম। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি নৈতিক দায়িত্বও। শ্রমিকের প্রতি এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তা শিল্পের স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সুনাম—উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ঈদ সামনে রেখে সরকার ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে,১২ মার্চের মধ্যেই দেশের সব গার্মেন্টস শ্রমিকের বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মালিকপক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে শ্রমিকরা নিশ্চিন্তে ঈদের প্রস্তুতি নিতে পারেন এবং শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার কোনো সুযোগ না থাকে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে যে অবস্থান তৈরি করেছে, তার পেছনে রয়েছে লাখো শ্রমিকের নীরব পরিশ্রম। সেই শ্রমিকদের মুখে ঈদের হাসি নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার। তাই আমাদের প্রত্যাশা, এবার অন্তত সেই চিরচেনা অনিশ্চয়তার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে। ১২ মার্চের আগেই গার্মেন্টস শ্রমিকদের সব বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করা হোক।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।

