ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশ্যে এমন সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করছিলেন। আগে তিনি আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোকে মূলত ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ বলে ব্যাখ্যা করতেন। কিন্তু এবার তিনি আরও খোলাখুলিভাবে বলেছেন, এই পদক্ষেপ ‘পূর্ববর্তী’ এবং ‘প্রতিরোধমূলক’।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। বহুকাল ধরে নেতানিয়াহু বারবার দাবি করে আসছেন যে, ইরান নাকি পারমাণবিক বোমা তৈরির ‘মাত্র কয়েক মাস দূরে’ রয়েছে। কিন্তু এতদিনেও কোনো প্রমাণ বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করতে পারেননি।
বাস্তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। এর বড় কারণ হলো, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে, তা তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে তাদের আস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি।
বারাক ওবামা ও জো বাইডেনের রাষ্ট্রপতিত্বের সময় মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের নীতি মূলত দুই স্তম্ভে দাঁড়িয়েছিল। একদিকে ছিল ইসরায়েলের প্রতি পরিচিত ও প্রায় নিঃশর্ত কৌশলগত সমর্থন, অন্যদিকে ইরানের প্রতি তাদের তুলনামূলকভাবে ‘কম সহনশীল’ দৃষ্টিভঙ্গি।
এই নীতির পেছনে যে ‘যৌক্তিকতা’ তুলে ধরা হয়েছিল তা অনেকাংশে জড়িয়ে ছিল ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থানের সঙ্গে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, আইএসের উত্থান এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করেছিল, যা সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্বকে আরও উসকে দিয়েছিল এবং গোটা মুসলিম বিশ্বের ভেতরের বিভাজনকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছিল।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। আরব, পারস্য, তুর্কি, কুর্দি, বালুচসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সন্দেহ, বিভাজন ও সংঘাতকে আরও তীব্র করে তোলা হয়। যখন এই ধরনের বিভাজনের রাজনীতি কার্যকর হয়ে ওঠে, তখন পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা যায় অঞ্চলটির বিদ্যমান রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক সত্তাগুলোকে আরও খণ্ড-বিখণ্ড করার প্রবণতা। তাদের আকার, জোট বা রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন, ভাঙন ও পুনর্গঠনের চাপ বাড়তে থাকে।
এদিকে আজ যে ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার লড়াই করছে, সেটি মূলত এই সমীকরণের শিয়া অংশের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান নিজেকে এমন এক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে, যারা আইসিস বা একই ধরনের মতাদর্শী (পশ্চিমাদের তৈরি সন্ত্রাসী) গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
সম্ভবত দীর্ঘদিন আগেই তেহরান বুঝে গেছে যে, আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি বড় মূল্য দিতে হবে তাদের। একই সঙ্গে তারা এটাও উপলব্ধি করেছে, বিশ্ব রাজনীতির নিয়মকানুন কীভাবে কাজ করে এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কতটা গভীর।
ইরানের এই শাসনব্যবস্থার অনেক রাজনীতিবিদ পশ্চিমা, বিশেষ করে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করেছেন। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে গভীর ধারণা রাখতেন। একই সঙ্গে তারা বুঝতেন, এই সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটেনের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাষ্ট্রের সীমা নির্ধারণ ও রাজনৈতিক কাঠামো গঠনে এই পুরোনো ঔপনিবেশিক শক্তির বড় ভূমিকা ছিল। আজও বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্মৃতি সেই প্রভাবকে ধরে রেখেছে, যা অঞ্চলটিতে তাদের কৌশল ও অবস্থানকে প্রভাবিত করে।
২০০৩ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন যখন ইরাক আক্রমণ করেন এবং সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর দেশটি কার্যত নতুন শক্তির প্রভাবের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন অনেক বিশ্লেষকের মতে, তেহরানের সামনে একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়। সে সময় বা পরবর্তী প্রশাসনগুলোর কেউই সিরিয়াতে বাশার আল-আসাদের সরকার কিংবা লেবাননে হিজবুল্লাহর মাধ্যমে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে খুব কঠোর অবস্থান নেয়নি। এতে তেহরানের অনেক নীতিনির্ধারকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়, ওয়াশিংটন হয়তো এই বিস্তারকে সহ্য করবে।
এই ধারণা থেকে তারা মনে করেছিল, নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব বা ‘বিপ্লব রপ্তানি’ প্রকল্পকে তারা রক্ষা করতে পারবে। একই সঙ্গে ইরানের ভেতরের শহরগুলোকে মার্কিন বা ইসরায়েলি সরাসরি প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে দূরে রাখতে পারবে।
ফলে তাদের কৌশল হয় সরাসরি ইরানি ভূখণ্ডকে যুদ্ধক্ষেত্র না বানিয়ে প্রয়োজনে লেবানন, সিরিয়া, এমনকি ইরাক ও ইয়েমেনের মাটিতে প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিকভাবে মোকাবিলা করা। এভাবে সংঘাতের ভার অন্য অঞ্চলে ঠেলে দিয়ে ইরানের মূল ভূখণ্ডকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে বলে তারা ধরে নিয়েছিল।
এরই মধ্যে যখন এ অঞ্চলের আরব রাজনীতি অভ্যন্তরীণ বিরোধ, ক্ষোভ ও তৈরি করা শত্রুতার চাপে ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল; তখন ইরান ধীরে ধীরে নিজের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে থাকে এবং আরব বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়ে তার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপও আরও তীব্র করে তোলে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি রাজনীতির একটি অংশ, বিশেষ করে সম্প্রসারণবাদী শাখা, ফিলিস্তিনি প্রশ্নের অবশিষ্ট অংশটুকুও মুছে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনি জনগণ, তাদের রাজনৈতিক দাবি ও ঐতিহাসিক স্মৃতিকে দুর্বল করে দেওয়া। এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে আন্তঃফিলিস্তিনি বিভাজন। গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বিভক্তি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।
এ সময়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেও একাধিক ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হন। এসব মামলার চাপ এড়াতে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল নেন। সংসদে বসতি স্থাপনকারী-সমর্থক ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন কাজে লাগিয়ে এবং সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে জোট গড়ে তিনি কালক্ষেপণ করতে থাকেন। লক্ষ্য ছিল প্রতিদ্বন্দ্বীদের ধীরে ধীরে দুর্বল করা, ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং বিচারিক জবাবদিহিতার ঝুঁকি এড়ানো।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার বিরোধীদের দুর্বলতাও স্পষ্ট হতে থাকে। অতি-অর্থোডক্স ও বসতি স্থাপনকারী মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়তে থাকে। তাদের অনেকেই বিদেশি সমর্থন, বিশেষ করে মার্কিন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর সহায়তা পেয়ে থাকে।
এ প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসেন। তার রাজনৈতিক ভিত্তির একটি অংশও একই ধরনের ধর্মীয় ও রক্ষণশীল চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে অনেক বিশ্লেষকের মতে, তার অবস্থান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে তার কৌশলগত পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাধীনতা দেয়।
এই অবস্থায় ইরান নিজেকে এমন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে দেখতে শুরু করে, যা হয়তো আগে পুরোপুরি কল্পনা করা হয়নি। যদিও অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগেই এই সংকটের পূর্বাভাস স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
ধারণা করা হয়েছিল, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো আঘাতে তেহরানের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সীমিত ও দেরিতে আসতে পারে। তবে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার ঘটনায় দ্রুত এবং শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দিয়েছে ইরান। যদিও তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে হারাতে হয়েছে। ফলে পুরো অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, যদি তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে বা পতনের দিকে যায়, তাহলে এর সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধাভোগী হিসেবে দাঁড়াতে পারে ইসরায়েল। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আরও খণ্ডিত হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে, যা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে।
অন্যভাবে বললে, যদি চলমান সংঘাতের লক্ষ্যগুলো বাস্তবে অর্জিত হয়, তাহলে শুধু একটি নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতাই তৈরি হবে না। বরং পুরো অঞ্চলজুড়ে একটি বড় ধরনের পুনর্গঠন দেখা যেতে পারে। এতে রাজনীতির কাঠামো, জোট ও আনুগত্যের ধরন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এমনকি সামাজিক বাস্তবতাও বদলে যেতে পারে।
কিছু পর্যবেক্ষকের আশঙ্কা, এই পরিবর্তন শুধু ভবিষ্যত নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তারা মনে করেন, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ইতিহাস ও পরিচয়ের ব্যাখ্যাও নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা হতে পারে। অর্থাৎ অতীতের ঘটনাগুলোকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা, কিছু উপাদানকে গুরুত্বহীন করে দেওয়া বা নতুন পরিচয় ও বর্ণনা তৈরি করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কৌশলগত নীতিতে নতুন কিছু জোটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে আঞ্চলিক শক্তি যেমন তুরস্ক কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে ভবিষ্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা উত্তেজনার সম্ভাবনা নিয়েও বিভিন্ন বিশ্লেষণে আলোচনা হচ্ছে।
লেখক: শিক্ষার্থী, মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ






