ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জনগণের স্বপ্ন পূরণে নতুন দিগন্তের পথে তারেক রহমানের সরকার

আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশিত: মার্চ ১৬, ২০২৬, ১২:৪০ এএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের প্রথম দিককার পদক্ষেপগুলো পর্যবেক্ষণ করলে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা যায়—এই সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্নে একটি দৃশ্যমান গতি তৈরি করার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা প্রায়ই দেখেছি, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার পর ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। কিন্তু বর্তমান সরকারের কার্যক্রমে একটি ভিন্ন প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ভোট দেওয়ার সময় নাগরিকদের নখে যে অমোচনীয় কালি লাগানো হয়, সেই কালি মুছে যাওয়ার আগেই সরকার একের পর এক নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে—যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে।

নতুন সরকারের কর্মসূচিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক সুরক্ষা ও গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের সূচনা হয়েছে। গত ১০ মার্চ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করেছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর আওতায় আনা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও সহায়তা থাকলেও সেগুলোর মধ্যে প্রায়ই সমন্বয়ের অভাব দেখা গেছে। ফ্যামিলি কার্ড সেই ব্যবস্থাকে একটি কেন্দ্রীভূত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই, ১৪ মার্চ সরকার ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানী ভাতা প্রদান কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছে। দেশের হাজার হাজার মসজিদে দায়িত্ব পালন করা ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল। সমাজে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তাদের আর্থিক অবস্থা অনিশ্চিত ছিল। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সম্মানী ভাতা চালুর এই উদ্যোগকে অনেকেই একটি সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

এর পরপরই ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলা থেকে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই কর্মসূচির মাধ্যমে একযোগে ৫৩টি খালের খনন কাজ শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। দিনাজপুরের সাহাপাড়া–বলরামপুর এলাকায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খাল পুনঃখননের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে।

খাল খনন কর্মসূচির বিষয়টি বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একসময় গ্রামবাংলার জনপদ, কৃষি ও জীবিকার সঙ্গে খালগুলোর সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য। নদী থেকে খাল, খাল থেকে বিল—এই প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের নেটওয়ার্ক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষি উৎপাদন এবং গ্রামীণ জীবনের ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু অবহেলা, দখল এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে দেশের অসংখ্য খাল আজ মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। এর ফলে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা, সেচ সংকট এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে অনেকেই কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসেবে দেখছেন না; বরং এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক জলব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। খালগুলো যদি পুনরুদ্ধার করা যায়, তাহলে বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ তৈরি হবে এবং একই সঙ্গে সেই পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে।

খাল পুনঃখননের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রামীণ অর্থনীতিতে বহুমুখী সম্ভাবনা সৃষ্টি করা। খালের পানিতে মাছ চাষ, হাঁস পালন, জলজ উদ্ভিদ চাষ এবং খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ—এসব কার্যক্রম স্থানীয় মানুষের আয়ের নতুন পথ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ এটি শুধু পানি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; বরং একটি সম্ভাবনাময় গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি করতে পারে।

নতুন সরকারের আরেকটি দিক হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ক্ষমতায় আসার পর সরকার জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকারের পদটি বিরোধী দলের জন্য ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এমন উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না। যদিও বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি, তবুও এই পদক্ষেপটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।

একই সঙ্গে প্রশাসনিক আচরণেও কিছু প্রতীকী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। মন্ত্রীদের মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন, সরকারি দপ্তরে কার্যক্রম তদারকি এবং প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্যোগগুলো অন্তত একটি বার্তা দিচ্ছে—সরকার নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকেও গুরুত্ব দিতে চায়।

অবশ্য বাস্তবতা হলো, কোনো সরকারের প্রথম দিককার পদক্ষেপই তার সম্পূর্ণ সফলতার নিশ্চয়তা দেয় না। রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ—সবকিছু মিলিয়ে সরকার পরিচালনা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। তবে শুরুটা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা নিয়ে হয়, তাহলে ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই একটি জবাবদিহিমূলক, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকারী এবং জনমুখী সরকার প্রত্যাশা করে এসেছে। সেই প্রত্যাশা পূরণ করা সহজ কাজ নয়। কিন্তু যদি নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে বলা যায়—বাংলাদেশের রাজনীতি একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের পথে যাত্রা শুরু করেছে।

এখন সময়ই বলে দেবে—এই সূচনা কতটা শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে আপাতত এটুকু বলা যায়, নতুন সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো জনমনে একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা তৈরি করতে পেরেছে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com