ইসলামের প্রতিটি বিধানের পেছনে রয়েছে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী দর্শন। ‘ইসলাম’ শব্দের মূল অর্থই হলো আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দেওয়া, তথা আত্মসমর্পণ করা। এই আত্মসমর্পণের অন্যতম এক উজ্জ্বল ও জীবন্ত পরীক্ষা হলো ‘কোরবানি’। এটি কেবল একটি প্রথা বা উৎসব নয়; বরং জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে হালাল পশু জবেহ করার এক মহান আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজকের ভোগবাদী ও লৌকিকতার যুগে কোরবানির সেই মূল চেতনাটি প্রায়শই চাপা পড়ে যাচ্ছে। কেউ মেতে উঠছেন বাহ্যিক আড়ম্বরে, আবার কেউ নানামুখী খোঁড়া যুক্তি ও আধুনিক অজুহাতে এই অলঙ্ঘনীয় বিধান থেকে দূরে থাকার চতুর পথ খুঁজছেন। এই সমসাময়িক সংকটে দাঁড়িয়ে কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য, হালাল উপার্জনের শর্তহীন গুরুত্ব এবং এর আত্মিক ও সামাজিক দিকটি নতুন করে অনুধাবন করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
হালাল উপার্জন : কোরবানি কবুল হওয়ার একমাত্র পূর্বশর্ত
কোরবানির ময়দানে নামার আগে মানুষের নিয়ত এবং তার পকেটের অর্থের উৎস—এই দুটি বিষয়ের ওপর আল্লাহর দরবারে ইবাদত কবুলের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে। ইসলামে অবৈধ বা হারাম উপার্জনের কোনো স্থান নেই, তা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন।
কোনো ব্যক্তি যদি সারা বছর অন্যায়, দুর্নীতি, সুদ, ঘুষ কিংবা চুরির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেন এবং বছর শেষে কোটি টাকার পশু কিনে ঢোল পিটিয়ে, রাজকীয় আয়োজনে লোকদেখানোর কুরবানি দেন—তবে আল্লাহর দরবারে তার মূল্য শূন্য। এটি কোনো ইবাদত নয়; বরং নিজের অপরাধবোধ ঢাকার কিংবা সমাজে নিজের মিথ্যা আভিজাত্য জাহির করার এক কৃত্রিম ও বাহ্যিক মহড়া মাত্র।
রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।
তাই যার সম্পদের উৎস পবিত্র নয়, তার জন্য কোরবানির এই বাহ্যিক আড়ম্বর সম্পূর্ণ অর্থহীন। সম্পদ শতভাগ হালাল হওয়াই কুরবানির প্রথম এবং প্রধান শর্ত।
সম্পদের পবিত্রতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
কোরবানি কেবল একটি ত্যাগ নয়, এটি একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সীমারেখা বা ‘নিসাব’ দ্বারা নির্ধারিত দায়িত্ব। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, নিজের নিত্যদিনের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার পর, হালাল উপার্জিত অর্থ যদি এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর সাড়ে সাত তোলা (ভরি) স্বর্ণ অথবা সাড়ে বাহান্ন তোলা রূপার সমপরিমাণ মূল্যে পৌঁছায় (বর্তমান বিশ্ববাজারের মূল্যমান অনুযায়ী)—তবেই সেই ব্যক্তির ওপর কুরবানি করা বাধ্যতামূলক বা ওয়াজিব হয়ে যায়।
এই বিধানের সামাজিক সৌন্দর্যটি অত্যন্ত গভীর। কোরবানি মানেই হলো আল্লাহর দেওয়া হালাল পশুটিকে তাঁরই নামে জবেহ করে, তার মাংসকে সমান তিন ভাগে ভাগ করে দেওয়া-
এক ভাগ : নিজের পরিবারের জন্য।
এক ভাগ : আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য।
এক ভাগ : সমাজের সেইসব অভাবী ও গরিব-দুঃখীদের জন্য, যারা সারা বছর ভালো মানের একটু মাংস কিনে খাওয়ার সুযোগ পায় না।
এই বণ্টনের মাধ্যমে মানুষের মনের ভেতরের সম্পদের প্রতি যে অন্ধ মোহ বা কৃপণতা থাকে, তা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। নিজের কষ্টের উপার্জনকে আল্লাহর আদেশে মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল সম্পদের প্রকৃত পবিত্রতা ও আত্মিক তৃপ্তি অর্জিত হয়। এটি সমাজের ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্যের দেওয়ালটি ভেঙে এক পরম সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে। আর হ্যাঁ, দুইভাগ না দিয়ে সবকিছুর নিজের ভাগে রাখতে পারেন, তবে সেটা কুরবানি হবে না বরং সেটি হবে, আল্লাহর বিধানের সঙ্গে সরাসরি গাদ্দারি।
'নফস নিয়ন্ত্রণ' বনাম কুরবানি থেকে বিরত থাকার ফাঁদ
বর্তমান সমাজে তথাকথিত প্রগতিশীল বা আধুনিকতার নামে এক শ্রেণীর মানুষকে বলতে শোনা যায়, বাহ্যিক পশু কোরবানি করার চেয়ে নিজের মনের পশুকে কোরবানি দেওয়াই আসল কোরবানি। আবার কেউ কেউ একধাপ এগিয়ে বলেন, আমার তো পূর্ণ আত্মশুদ্ধি বা ভেতরের রূহানিয়াত তৈরি হয়নি, আমার তো অনেক গুনাহ, তাই আমি কোরবানি করছি না।
খুব গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, এগুলো মূলত আল্লাহর একটি অলঙ্ঘনীয় ইবাদত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার অত্যন্ত চতুর ও সূক্ষ্ম এক ফাঁদ। ইসলামি শরিয়তের অকাট্য নিয়ম অনুযায়ী, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক বা সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর নির্দিষ্ট দিনে পশু জবেহ করা একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও জরুরি বিধান।
ভেতরের নফস বা মনের পশুকে নিয়ন্ত্রণ করা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সার্বক্ষণিক সাধনা। কিন্তু সেই সাধনার অজুহাত দেখিয়ে আল্লাহর দেওয়া একটি স্পষ্ট এবং সরাসরি আদেশকে অমান্য করা প্রকারান্তরে শরীয়তের অবমাননা। সামর্থ্য থাকার পরও যারা এই ধরনের আধ্যাত্মিক বা যৌক্তিক ফাঁকি দিয়ে কোরবানি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর ভাষা ব্যবহার করে বলেছেন-
"যার কুরবানি করার সামর্থ্য রয়েছে অথচ সে কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।"
তাসকিয়াতুন নফস (আত্মশুদ্ধি) এর সঠিক সংজ্ঞা
অনেকে ‘তাসকিয়াতুন নফস’ বা আত্মশুদ্ধির অর্থকে গুলিয়ে ফেলেন। আত্মশুদ্ধি মানে কেবল সম্পদের প্রতি লোভ না থাকা নয়। এর প্রকৃত ও গভীর অর্থ হলো—মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের আত্মিক ব্যাধি (যেমন : মিথ্যা, গীবত, অহংকার, হিংসা, রিয়া বা লোকদেখানোর মানসিকতা এবং জুলুম) থেকে নিজের আত্মাকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র রাখা।
আজকের কলুষিত ও ফেতনার যুগে কোনো মানুষের পক্ষে ‘শতভাগ নিষ্পাপ’ বা সম্পূর্ণ নিখুঁত আত্মশুদ্ধি অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ইসলাম কখনোই ইবাদত করার জন্য ‘শতভাগ নিষ্পাপ হওয়া’কে পূর্বশর্ত করেনি। মানুষ তার হাজারো ভুলত্রুটি, সীমাবদ্ধতা আর গুনাহের বোঝা নিয়েই আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হবে, কোরবানির পশু জবেহ করবে। আর এই ইবাদতের ভেতরে যে নূর ও বরকত রয়েছে, তার মাধ্যমেই বান্দা ধীরে ধীরে গুনাহ থেকে মুক্ত হওয়ার এবং নফসকে জয় করার ভেতরের শক্তি লাভ করবে। ইবাদত ছেড়ে দিলে আত্মশুদ্ধি কখনো আসবে না, বরং ইবাদতের মাধ্যমেই আত্মশুদ্ধির পথ সুগম হয়।
কোরবানি হলো মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং সামাজিক ও আর্থিক কল্যাণের এক অপূর্ব, নিখুঁত সমন্বয়। বাহ্যিক ইবাদত হিসেবে আল্লাহর রাহে পশু জবেহ করা যেমন বান্দার জন্য এক অলঙ্ঘনীয় ও শর্তহীন আদেশ, তেমনই নিজের অন্তরের নিয়তকে লোক দেখানোর মানসিকতা থেকে মুক্ত রাখা এবং ভেতরের অহংকারকে ধূলিসাৎ করাও বান্দার প্রধান দায়িত্ব।
একটি বিষয়ের অভাবকে উছিলা বানিয়ে অন্য একটি মূল ইবাদতকে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। অতএব, আমাদের প্রত্যেকের উচিত—যাবতীয় লৌকিকতা ও খোঁড়া যুক্তি পরিহার করে, শতভাগ হালাল উপার্জনের মাধ্যমে, সঠিক নিয়তে কোরবানির এই মহান ইবাদতে শামিল হওয়া এবং এর উছিলায় পরম করুণাময়ের পরম ‘কুরবত’ বা নৈকট্য অর্জন করা।

