বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে তর্ক-বিতর্ক চলছে। সংবিধানটি বাতিল বা ‘ছুড়ে ফেলা’ প্রসঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুরোনো বক্তব্য। বিশেষ করে সংসদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের দাবি—খালেদা জিয়াও নাকি বাহাত্তরের সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বলেছিলেন। তবে এ বক্তব্য ঘিরে রয়েছে ভিন্ন ব্যাখ্যা।
সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, তরুণ নেতা ও বিভিন্ন মহল থেকে ‘বাহাত্তরের সংবিধান’ বাতিল বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি জোরালো হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ।
গত ৩১ মার্চ সংসদে বিরোধী দলের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘সংবিধান ছুড়ে ফেলব কেন? এই সংবিধানে এত গাত্রদাহ কেন? সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় এটি একাত্তরের পরাজয়ের দলিল?’
অন্যদিকে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘বাহাত্তরের সংবিধানের সঙ্গে লাখো শহীদের রক্তের ঋণ জড়িয়ে আছে। লাখো মা-বোনের সম্ভ্রম জড়িয়ে আছে। এই সংবিধানকে সামনে রেখেই যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।’
এর আগে, গত ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদে এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘নতুন প্রজন্ম বা “জেন-জি” বাহাত্তরের সংবিধান চায় না। তারা জবাব চায়—স্বাধীনতার ৩০ বছর পরে জন্ম নেওয়া আমাদের মতো নাগরিকরা কেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে?’
পরদিন জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বিএনপির উদ্দেশে বলেন, ‘যে সংবিধান খালেদা জিয়া ছুড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন, সেই বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি সরকারি দলের এত আগ্রহ কেন—তা জনগণ জানতে চায়।’
পরবর্তীতে একই ইস্যুতে সংসদে আরও আলোচনা হয়। কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘খালেদা জিয়া, যিনি গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সংগ্রাম করেছেন, তিনি বলেছিলেন—যেদিন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সংসদ জনগণের নিয়ন্ত্রণে যাবে, সেদিন এই সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে।’
তবে খালেদা জিয়ার মূল বক্তব্য কী ছিল—তা জানতে ফিরে যেতে হয় ২০১১ সালের প্রেক্ষাপটে। ওই বছরের ৩০ জুন আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এ সংশোধনের বিরোধিতা করে।
এরপর জুলাই মাসে বিএনপির এক গণঅনশন কর্মসূচিতে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ বিভিন্ন সংশোধনী এনেছে। আমরা বলতে চাই, এসব সংশোধনী আওয়ামী লীগের ইশতেহার। এটি জনগণ মানে না। আগামী সরকার পরিবর্তনের পর এসব সংশোধনী ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে খালেদা জিয়া সরাসরি পুরো সংবিধান বা বাহাত্তরের সংবিধান ‘ছুড়ে ফেলে দেওয়া’ হবে—এমন কোনো বক্তব্য দেননি। বরং তিনি নির্দিষ্ট কিছু সংশোধনী বাতিলের কথাই উল্লেখ করেছিলেন।
এ প্রসঙ্গে বিতর্ক সৃষ্টি হলে সে সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, ‘সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে বা গ্রহণযোগ্য নয়—খালেদা জিয়ার এ অভিপ্রায়ের অর্থ হচ্ছে, তার দল ক্ষমতায় গেলে পঞ্চদশ সংশোধনী পরিবর্তন করবে।’
তথ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়া সরাসরি সংবিধান বাতিলের কথা বলেননি; বরং নির্দিষ্ট সংশোধনী বাতিলের কথাই বলেছেন। ফলে তার বক্তব্যকে পুরো সংবিধান ‘ছুড়ে ফেলার’ আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করা কতটা সঠিক—তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন