ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

তারেক রহমানকে যেভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৫, ২০২৫, ০১:৪৪ পিএম
তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত

তারেক রহমানযিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনের একজন সাক্ষী এবং অংশগ্রহণকারী। তার জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। জন্মের মাত্র ছয় বছরের মাথায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাকেসহ তার মা (খালেদা জিয়া) ও ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কারাবন্দি হওয়া সর্বকনিষ্ঠ কারাবন্দিদের একজন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৬ সালে এরশাদের স্বৈরাচারী সরকার তাকে তার মায়ের সঙ্গে গৃহবন্দি করে রাখে একাধিকবার। এরপর ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে থাকেন তিনি। তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা যখন বাড়ছিল তখন, অর্থাৎ ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে তার বিরুদ্ধে তৎকালীন আওয়ামী লীগ ১/১১-এর সেনাসমর্থিত সরকার এবং সুশীল সমাজের একটি প্রভাবশালী অংশ বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে চিত্রিত করেছিল। আওয়ামী লীগের সব স্তরের নেতাকর্মী তাকে নিয়ে অপতথ্য ব্যাপকভাবে প্রচার করেছিল।

তবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর এবং স্পর্শকাতর অভিযোগটি আনা হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকে কেন্দ্র করে। যদিও তার কোনো সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সামরিক শাসকদের বেআইনি ক্ষমতা দখলের পর তার বিরুদ্ধে আরও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ব্যক্তিরা দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করতে বাধ্য করেছিল। সেই অভিযোগে ২০০৭ সালের মার্চে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে মইনুল রোডের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে তার মা খালেদা জিয়া ও তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকেও গ্রেপ্তার করা হয়। রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না থেকেও কোকোকে প্রতিহিংসাবশত গ্রেপ্তার করা হয়। পরে প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতায় কোকোর অকালমৃত্যু জিয়া পরিবারে নেমে আসে গভীর শোক।

এদিকে রিমান্ডে থাকাকালীন তারেক রহমানের ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। মেরুদণ্ড, পাঁজর ও হাঁটুতে গুরুতর আঘাতে তিনি প্রায় পঙ্গুত্বের পর্যায়ে পৌঁছান। দীর্ঘ ১৮ মাসের কারাভোগ ও অমানবিক নির্যাতনে যখন তারেক রহমান প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি, তখন আদালতের নির্দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাকে লন্ডনে পাঠানো হয়। কিন্তু সেই যাত্রা ছিল না কেবল চিকিৎসার, সেটিই হয়ে ওঠে জন্মভূমি থেকে এক দীর্ঘ বিচ্ছেদের শুরু।

আওয়ামী লীগ দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র, সরকারি মিডিয়া এবং পাঠ্যপুস্তকে তারেক রহমানকে নিয়ে এমনভাবে প্রচার করে যে, মানুষের মধ্যে তারেক রহমান সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে অন্তত অর্ধশতাধিক মামলা এবং বেশ কিছু মামলায় সাজাও দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, আওয়ামী সরকার দেশের গণমাধ্যমে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার নিষিদ্ধ করেছিল।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ উন্মোচিত হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাসহ দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দায়ের করা সবকটি মামলা থেকেই উচ্চ আদালত তাকে বেকসুর খালাস দেন।

সাম্প্রতিক রায়ে উচ্চ আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যে, ২১ আগস্টের মতো জঘন্য ঘটনায় তারেক রহমানকে জড়ানো হয়েছিল কোনো দালিলিক প্রমাণ ছাড়াই, মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এবং জোরপূর্বক আদায় করা জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে।

৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আইনি বাধার প্রাচীর একে একে সরে গেলেও তারেক রহমান ঠিক কবে নাগাদ দেশের মাটিতে পা রাখবেন, তা নিয়ে জনমনে তুমুল আগ্রহ ছিল। অবশেষে দীর্ঘ ১৭ বছর ৩ মাস ১৫ দিন পর মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।