দীর্ঘদিনের আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলা শরিক দলগুলোর সঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতা হলেও সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় বিদ্রোহ। যেসব আসন শরিকদের ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি, সেখানেই মাঠে রয়েছেন দলটির একাধিক প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। এতে বিব্রত অবস্থায় পড়েছে বিএনপি নেতৃত্ব।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এ পরিস্থিতি সামাল দিতে সারাদেশে বিদ্রোহী প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করেছে দলটি। পাশাপাশি গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে পর্যায়ক্রমে ডেকে নেওয়া হচ্ছে বিদ্রোহী নেতাদের। ইতোমধ্যে কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন।
একে একে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা
বৃহস্পতিবার দুপুরে গুলশান কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ একে একরামুজ্জামান। সাক্ষাতের পর এক ভিডিও বার্তায় তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ভিডিওতে তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে ২০ বছরের বেশি সময়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং খালেদা জিয়ার প্রতি সম্মান ও তারেক রহমানের নির্দেশনার প্রতি আনুগত্য থেকেই তিনি ধানের শীষের সমর্থনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন।
একরামুজ্জামান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় তাকে বহিষ্কার করা হয়। যদিও তিনি এর আগে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে একাধিকবার নির্বাচন করেছেন এবং দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন।
ঝিনাইদহ-৪ আসনেও একই চিত্র। স্বতন্ত্র প্রার্থী মুর্শিদা খাতুন (মুর্শিদা জামান পপি) মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। তিনি জেলা বিএনপির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুজ্জামান বেল্টুর স্ত্রী।
যে কারণে বাড়ছে চাপ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনটি বিএনপি ছেড়ে দিয়েছে মিত্র দল গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকির জন্য। কিন্তু এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি এমএ খালেক। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাকে বহিষ্কার করা হলেও বুধবার সন্ধ্যায় তিনিও গুলশানে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সাক্ষাতের পর বিএনপির ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে—এমএ খালেকসহ আরও কয়েকজন বিদ্রোহী প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে পারেন।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সাবেক এমপি আতাউর রহমান খান আঙ্গুর। তাকেও গুলশানে ডেকে কথা বলেছেন তারেক রহমান—এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন দলীয় একটি সূত্র।
দলীয় শৃঙ্খলা বনাম ভোটের বাস্তবতা
মাদারীপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান পলাশ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ফেসবুক স্ট্যাটাসে দলীয় আনুগত্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা উল্লেখ করেন।
সুনামগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান চৌধুরীও একই পথ অনুসরণ করেছেন। ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় তিনি জানান, ভোটারদের ভালোবাসা সত্ত্বেও দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অনুরোধ উপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
বিদ্রোহ ঠেকানো বিএনপির জন্য কতটা জরুরি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এবার শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতায় অটল থাকতে চায়। কিন্তু তৃণমূল ও সাবেক প্রভাবশালী নেতাদের বিদ্রোহ সেই কৌশলকে দুর্বল করতে পারে। একদিকে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যদিকে ভোটের মাঠে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখা—এই দ্বন্দ্বই এখন বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ।
গুলশানে ধারাবাহিক বৈঠকগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিএনপি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে সব বিদ্রোহীকে এক ছাতার নিচে আনা যাবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন