প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে বিদেশি কর্মীদের নিয়মিত শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার, ভিসার শর্ত ভঙ্গ করে কম খরচে জনবল নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির নামে অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে অস্ট্রেলিয়া। সাবক্লাস ৪০৭ প্রশিক্ষণ ভিসার অপব্যবহার ঠেকাতে অস্ট্রেলিয়ান বর্ডার ফোর্স (এবিএফ) ও স্বরাষ্ট্র বিভাগ যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চার মাসব্যাপী এই অভিযানের প্রথম ধাপেই অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলে ১০০টির বেশি কর্মস্থল পরিদর্শন করেছেন কর্মকর্তারা। ডারউইন, টাউনসভিল, গোল্ড কোস্ট, হার্ভে বে, সেন্ট্রাল কোস্ট, গোলবার্ন, অ্যালবারি, ওয়াগা ওয়াগা, গ্রিফিথ, ব্যালার্যাট, ক্যানবেরা এবং মার্গারেট রিভারসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রশিক্ষণার্থী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আগামী মাসগুলোতে আরও ২০০টির বেশি কর্মস্থল পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে এমন কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ভিসাধারীদের জন্য নির্ধারিত কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ বাস্তবে পরিচালিত হচ্ছে না। কোথাও কাগজে-কলমে প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে প্রশিক্ষণার্থীদের সাধারণ কর্মচারীর মতো কাজে লাগানো হচ্ছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কহীন কাজেও ভিসাধারীদের নিয়োজিত করার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযানের অংশ হিসেবে এবিএফ কর্মকর্তারা ফেয়ার ওয়ার্ক ওমবাডসম্যানের সহযোগিতায় কর্মস্থল পরিদর্শন, নথিপত্র যাচাই এবং নিয়োগকর্তা ও প্রশিক্ষণার্থীদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। বিশেষভাবে যাচাই করা হচ্ছে, সরকারের কাছে জমা দেওয়া প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কি না এবং প্রশিক্ষণার্থীরা অনুমোদিত পেশাগত ক্ষেত্রেই কাজ করছেন কি না।
সাবক্লাস ৪০৭ ভিসার মূল উদ্দেশ্য হলো বিদেশি নাগরিকদের নির্দিষ্ট পেশায় দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রভিত্তিক অভিজ্ঞতা অর্জন এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া। এটি স্থায়ী বা নিয়মিত চাকরির বিকল্প নয়। অথচ কিছু অসাধু নিয়োগকর্তা এই কর্মসূচিকে সস্তা শ্রম সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সাবক্লাস ৪০৭ ভিসার প্রায় ৫৫ শতাংশ আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে অথবা আবেদনকারীরা নিজেরাই আবেদন প্রত্যাহার করেছেন। কর্তৃপক্ষ বলছে, ভিসা কর্মসূচির অপব্যবহার রোধে আবেদন যাচাই ও পর্যবেক্ষণ আগের তুলনায় আরও কঠোর করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান বর্ডার ফোর্সের ফিল্ড অপারেশনস অ্যান্ড স্পনসর মনিটরিং কমান্ডার জন টেলর বলেছেন, প্রশিক্ষণ ভিসায় থাকা অভিবাসীদের শোষণের বিষয়ে তাদের কোনো সহনশীলতা নেই। প্রশিক্ষণ ভিসার মূল উদ্দেশ্য দক্ষতা উন্নয়ন নিশ্চিত করা। যারা এই কর্মসূচির অপব্যবহার করবে বা প্রশিক্ষণার্থীদের শোষণ করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্পনসরশিপের শর্ত লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা, লঙ্ঘন নোটিশ, স্পনসরশিপ বাতিল এবং ভবিষ্যতে বিদেশি কর্মী স্পনসর করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। অন্যদিকে ভিসাধারীদের ক্ষেত্রেও নিয়ম ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে ভিসা বাতিলসহ বিভিন্ন অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ফেয়ার ওয়ার্কের নিয়মানুসারে, ভিসার ধরন যাই হোক না কেন, অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত প্রত্যেক ব্যক্তি ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখেন। অভিবাসী কর্মী বা প্রশিক্ষণার্থীদের শোষণ করা অস্ট্রেলিয়ার আইনে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের অপরাধে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
সন্দেহজনক ভিসা জালিয়াতি, ভুয়া প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বা কর্মী শোষণের তথ্য ‘বর্ডার ওয়াচ’-এর মাধ্যমে গোপনীয়ভাবে জানানো যেতে পারে। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তা ও কর্মীরা ভিসা এনটাইটেলমেন্ট ভেরিফিকেশন অনলাইন (ভিইভিও) সিস্টেম ব্যবহার করে কাজের অধিকার ও ভিসার শর্ত যাচাই করতে পারবেন।
বাংলাদেশি কমিউনিটির সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল বলছেন, এই অভিযান শুধু ভিসা জালিয়াতি প্রতিরোধের উদ্যোগ নয়; বরং অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাদের মতে, প্রশিক্ষণ ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় যেতে আগ্রহীদের অনুমোদিত স্পনসর, প্রকৃত প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা এবং ভিসার শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে ভিসা কর্মসূচির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

