দূরদেশে বসেও মানুষ আসলে নিজের ভাষার কাছেই ফিরে যেতে চায়। তাই প্রতি বছর নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা হয়ে ওঠে শুধু বইয়ের আয়োজন নয়, বরং স্মৃতি, সংস্কৃতি ও শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন মিলনমেলা। আগামী ২২ থেকে ২৫ মে পর্যন্ত জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টার, নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের বইমেলা।
এই আয়োজনেই অংশ নিচ্ছে কবি মাহমুদুল হক ইফতির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধুতুরা ফুলের বিকাল। ‘জলধি’ প্রকাশন থেকে ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত বইটি ইতোমধ্যেই তরুণ পাঠক ও কবিতাপ্রেমীদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা মাহমুদুল হক ইফতি বর্তমানে পেশায় ব্যাংকার। তবে তার সৃজনজগত বিস্তৃত কবিতা, চলচ্চিত্র ও বাঁশির সুরে। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ নস্টালজিক মেঘদল। দীর্ঘ সময় পর প্রকাশিত ধুতুরা ফুলের বিকাল যেন সেই নস্টালজিয়ারই আরও গভীর, আরও অন্ধকার ও পরিণত রূপ।
এই বইয়ের কবিতাগুলোতে ঘন ঘন ফিরে আসে রাত, বৃষ্টি, মফস্বল, হারিয়ে যাওয়া বন্ধু, অসমাপ্ত প্রেম এবং এক ধরনের অস্তিত্বগত ক্লান্তি। কবি লিখছেন-
“এই পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে এ যাবত যত রাত
তাদের সকল অন্ধকারের যোগফল তোমার শূন্যতা...”
এই শূন্যতা নিছক ব্যক্তিগত নয়; বরং তা পুরো এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। বইটির কবিতাগুলোতে যেমন আছে নাগরিক বিষণ্নতা, তেমনি আছে স্বপ্নভঙ্গের পরও বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত জেদ।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বইটির নামকরণ কবিতা ধুতুরা ফুলের বিকাল। ধুতুরা, যে ফুল একই সঙ্গে সুন্দর, বিষাক্ত ও বিভ্রমময়, কবির কাছে হয়ে উঠেছে মানুষের যন্ত্রণা ও অস্তিত্ব সংকটের প্রতীক।
“অনিবার্য দুঃখের নীল এই গ্রহে
ধুতুরা ফুলের বিকাল নেমে আসে...”
ইফতির কবিতার ভাষায় একদিকে যেমন আছে বৃষ্টিভেজা বিকেলের কোমলতা, অন্যদিকে আছে ‘কসমিক রেডিয়েশন’, ‘সাবমেরিন’, ‘হার্ডডিস্ক’, ‘সাউন্ডক্লাউড’-এর মতো আধুনিক নাগরিক চিত্রকল্প। ফলে তার কবিতা একই সঙ্গে স্মৃতিময় এবং সমকালীন।
আবার কিছু কবিতায় উঠে আসে হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের বিদ্রোহী যৌবনের মুখ
“আমরা যারা করেছিলাম নিখুঁত ভুল
কাগজের ফুলে ঠুকেছিলাম স্যালুট
গোখরার ঠোঁটে চুমু দিয়ে বলেছিলাম—ভালোবাসি!”
এই পঙক্তিগুলো যেন শুধু কবিতার ভাষা নয়; বরং একসময় পৃথিবী বদলে দিতে চাওয়া তরুণদের অস্থির আত্মকথন।
সমকালীন বাংলা কবিতায় ধুতুরা ফুলের বিকাল স্মৃতি, বিষাদ, পরাবাস্তবতা ও আত্মদহনের এক স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ করেছে। নিউ ইয়র্ক বইমেলার মতো বহুসাংস্কৃতিক পরিসরে বইটির উপস্থিতি বাংলা কবিতার নতুন প্রজন্মের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকেও পৌঁছে দেবে প্রবাসী পাঠকদের কাছে।

