১৯৬৯ সালে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় গঠিত হয়েছিল ‘অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন’ (OIC)। বর্তমানে এটি ৫৭টি সদস্য দেশ নিয়ে জাতিসংঘে বিশ্ব মুসলিমের ‘সম্মিলিত কণ্ঠস্বর’ হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা এবং মুসলিম বিশ্বের বহুমুখী সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ওআইসি কতটুকু সফল? এই প্রশ্নটি বর্তমানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
১. ফিলিস্তিন সংকট ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা
ওআইসি-র জন্মই হয়েছিল ফিলিস্তিন ইস্যুতে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত ফিলিস্তিন ও গাজা ভূখণ্ডে চলমান মানবিক বিপর্যয় রোধে ওআইসি বৈশ্বিক পর্যায়ে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিনের অধিকার নিয়ে জোরালো সওয়াল করা এবং ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের কঠোর নিন্দা জানানোয় ওআইসি সক্রিয়। তবে মাঠপর্যায়ে সামরিক বা অর্থনৈতিক কোনো শক্ত পদক্ষেপ নিতে না পারায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।
২. মুসলিম বিশ্বের অনৈক্য ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল
ওআইসি-র সফলতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক স্বার্থের সংঘাত। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ইরান-তুরস্ক-সৌদি আরব প্রভাব বিস্তারের লড়াই এবং শিয়া-সুন্নি মেরুকরণ সংস্থটির ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বড় কোনো সংকটে সংস্থটি কেবল 'নিন্দা প্রস্তাব' গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
৩. আর্থ-সামাজিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা
রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও ওআইসি কিছু অরাজনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (IsDB): সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।
শিক্ষা ও প্রযুক্তি: সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার প্রসারে ওআইসি-র অঙ্গ সংগঠনগুলো কাজ করছে।
আন্তঃদেশীয় সংযোগ: ২০২৬ সালে গৃহীত নতুন পরিকল্পনায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রেল ও সড়ক পথে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে 'ইসলামি কমন মার্কেট' তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৪. ইসলামোফোবিয়া ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলায় ওআইসি-র ভূমিকা প্রশংসনীয়। বিশেষ করে ২০২৪-২৫ সালে বিভিন্ন দেশে পবিত্র কুরআন অবমাননার ঘটনায় ওআইসি যেভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়। জাতিসংঘের মাধ্যমে ১৫ মার্চকে 'আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়া বিরোধী দিবস' হিসেবে ঘোষণা করানো ওআইসি-র অন্যতম বড় সাফল্য।
৫. মানবিক ও ত্রাণ কার্যক্রম
রোহিঙ্গা সংকট, আফগানিস্তানের মানবিক বিপর্যয় এবং সিরিয়া বা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুতদের পাশে দাঁড়াতে ওআইসি বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গাম্বিয়া কর্তৃক রোহিঙ্গাদের পক্ষে যে আইনি লড়াই চলছে, তাতে ওআইসি-র পূর্ণ সমর্থন ও অর্থায়ন এর একটি ইতিবাচক দিক।
ওআইসি-কে পুরোপুরি সফল বা ব্যর্থ-কোনোটাই এককভাবে বলা যায় না। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা হলেও এর কোনো ‘নিজস্ব সামরিক বাহিনী’ নেই এবং এর সিদ্ধান্তগুলো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো আইনি ক্ষমতা নেই।
সফলতা: এটি মুসলিম বিশ্বকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে এবং ইসলামবিদ্বেষের মতো ইস্যুতে বৈশ্বিক ঐক্য তৈরিতে সফল হয়েছে।
ব্যর্থতা: কাশ্মীর বা ফিলিস্তিনের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংকটে প্রভাবশালী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ স্বার্থের কারণে কার্যকর কোনো 'অ্যাকশন' নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ভবিষ্যৎ ওআইসি-র সাফল্য নির্ভর করবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং একটি শক্তিশালী 'ইকোনমিক ব্লক' হিসেবে আত্মপ্রকাশের ওপর। ঐক্যবদ্ধ অর্থনৈতিক শক্তি ছাড়া কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন