এক সময় হজের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত মরুভূমির তপ্ত বালু আর মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে চলার দৃশ্য। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এবং সৌদি সরকারের ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় পাল্টে গেছে সেই চিরাচরিত চিত্র। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিক্স এবং স্মার্ট অ্যাপের ব্যবহারে হজ এখন অনেক বেশি সুশৃঙ্খল এবং আধুনিক। প্রযুক্তির এই ছোঁয়ায় হাজীদের ইবাদত পালন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি নিশ্চিত হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা।
নুসুক (Nusuk) অ্যাপ: পকেটে যখন গাইড
বর্তমান হজ ব্যবস্থাপনার প্রাণকেন্দ্র হলো ‘নুসুক’ অ্যাপ। এটি কেবল একটি সাধারণ অ্যাপ নয়, বরং একজন হাজীর ডিজিটাল গাইড।
সুবিধা: ওমরাহ বা হজের পারমিট নেওয়া, পবিত্র রওজা শরিফ জিয়ারতের সময় নির্ধারণ এবং যাতায়াতের তথ্য—সবই মিলছে এক ক্লিকে। এটি ভিড় নিয়ন্ত্রণ করে হাজীদের সুশৃঙ্খলভাবে চলাচলে সাহায্য করছে।
স্মার্ট কার্ড: এক কার্ডে সব সমাধান
হাজীদের জন্য এখন সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো ‘নুসুক স্মার্ট কার্ড’। এই কার্ডটি মূলত একজন হাজীর ডিজিটাল পরিচয়পত্র।
কী আছে এতে: হাজীর ব্যক্তিগত তথ্য, আবাসন ঠিকানা, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত রেকর্ড এবং কোন গ্রুপে তিনি হজ করবেন, তার সব ডেটা এখানে সংরক্ষিত।
কেন জরুরি: হারানো হাজীদের খুঁজে পেতে বা জরুরি চিকিৎসায় এই কার্ড স্ক্যান করেই তাৎক্ষণিক সহায়তা দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। চেকপয়েন্টগুলোতে দীর্ঘ লাইনে না দাঁড়িয়ে শুধু কার্ড স্ক্যান করেই যাতায়াত করা সম্ভব হচ্ছে।
রোবট ক্লিনার ও এআই হেল্প ডেস্ক
মক্কা ও মদিনার পবিত্র চত্বরে এখন নিয়মিত দেখা মেলে অত্যাধুনিক রোবটের।
পরিচ্ছন্নতা: স্বয়ংক্রিয় রোবটগুলো বিরতিহীনভাবে হারামাইন শরিফাইন পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখার কাজ করছে।
জমজম পানি ও তথ্য সেবা: কোনো কোনো রোবট হাজীদের জমজম পানি পরিবেশন করছে, আবার কোনোটি এআই ব্যবহার করে বহুভাষায় হাজীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। এর ফলে ভাষা সংক্রান্ত জটিলতা অনেকটাই কমে এসেছে।
দ্রুতগতির ট্রেন: ক্লান্তিহীন যাতায়াত
হজের অন্যতম কঠিন অংশ ছিল মক্কা, মদিনা, মিনা ও আরাফাতের মধ্যে যাতায়াত। ‘হারামাইন হাই-স্পিড রেলওয়ে’ এই চিত্র বদলে দিয়েছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে আটকে থাকার বদলে হাজীরা এখন ৩০০ কিলোমিটার বেগে দ্রুতগতির ট্রেনে যাতায়াত করছেন। এছাড়া ‘মাশায়ের মেট্রো’ মিনা, মুজদালিফা ও আরাফাতের মধ্যে হাজীদের যাতায়াতকে করেছে আরামদায়ক ও দ্রুততর।
ড্রোন ও থার্মাল ক্যামেরা
পুরো হজ এলাকার নিরাপত্তা ও ভিড় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে উন্নত ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে। এছাড়া হাজীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্থাপন করা হয়েছে থার্মাল ক্যামেরা, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরীরের তাপমাত্রা মেপে অসুস্থ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম।
প্রযুক্তির এই আধুনিকায়ন কেবল আভিজাত্য নয়, বরং লাখো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। সৌদি সরকারের এই ডিজিটাল উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে, যা হাজীদের কেবল শারীরিক কষ্টই কমায়নি, বরং তাদের একাগ্রচিত্তে ইবাদতে মগ্ন হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।


