ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানি ইতিহাসের শিক্ষা ও আধুনিক সমাজের প্রাসঙ্গিকতা 

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ১০:৪০ এএম
ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানি ফজিলত। ছবি : সংগৃহীত

মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। এই উৎসবের মূল অনুষঙ্গ হলো ‘কোরবানি’। আরবী ‘কুরবান’ শব্দ থেকে আসা এই শব্দটির অর্থ হলো-উৎসর্গ বা আল্লাহর নৈকট্য লাভ। কেবল পশু জবাই নয়, বরং কোরবানি হলো আল্লাহর প্রতি বান্দার আনুগত্য ও চরম ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

কোরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
কোরবানির ইতিহাস মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমেই কোরবানির প্রচলন শুরু হয়। তবে বর্তমানে আমরা যে কোরবানি পালন করি, তা মূলত মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মারক।

আল্লাহ তাআলা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে স্বপ্নে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানির নির্দেশ দেন। বার্ধক্যের একমাত্র সন্তান হজরত ইসমাইল (আ.)-কে যখন তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জবাই করতে উদ্যত হন, তখন আল্লাহ তাঁর একনিষ্ঠ আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে ইসমাইলের পরিবর্তে একটি জান্নাতি দুম্বা পাঠান। ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই সুন্নাহকেই কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য ইবাদত হিসেবে জারি রাখা হয়েছে।

কোরবানির ধর্মীয় মূল্যবোধ ও শিক্ষা
ইসলামে কোরবানির গুরুত্ব শুধু একটি প্রথা পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মূল্যবোধ:

তাকওয়া বা খোদাভীতি: পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, "আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না সেগুলোর মাংস এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।" (সূরা হজ: ৩৭)। অর্থাৎ, পশু কত বড় বা দামি, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো কোরবানিকারীর নিয়ত।

আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পন: নিজের মনের কুপ্রবৃত্তি, অহংকার এবং লোভকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর হুকুমের কাছে মাথা নত করাই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা।

সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব: কোরবানির মাংস তিন ভাগে ভাগ করে নিজের জন্য, আত্মীয়-স্বজন এবং দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার বিধান রয়েছে। এটি সমাজে ধনি-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে এবং পারস্পরিক হৃদ্যতা বাড়ায়।

কৃপণতা দূরীকরণ: সম্পদ ব্যয় করে পশু জবাই করার মাধ্যমে মানুষের মন থেকে কৃপণতা দূর হয় এবং আল্লাহর পথে ব্যয়ের মানসিকতা তৈরি হয়।

কোরবানি কবুলের শর্ত
ইসলামী গবেষকদের মতে, কোরবানি কবুল হওয়ার জন্য দুটি বিষয় অপরিহার্য:

১. হালাল উপার্জন: হারাম উপার্জনের টাকায় কোরবানি দিলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না।

২. বিশুদ্ধ নিয়ত: লোকদেখানো বা শুধু মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে কোরবানি দিলে তার কোনো সওয়াব নেই। নিয়ত হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

কোরবানি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, স্রষ্টার ভালোবাসার কাছে পৃথিবীর সব মায়া ও সম্পদ তুচ্ছ। প্রতি বছর কোরবানি আমাদের হৃদয়ে ত্যাগের সেই চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দীক্ষা দেয়।

তথ্যসূত্র: আল-কুরআন (সূরা হজ ও সূরা আস-সাফফাত), বুখারি ও মুসলিম শরিফ।