পবিত্র হজের শেষ পর্যায়ে মিনা প্রান্তরে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা হাজিদের জন্য এক অপরিহার্য বিধান। ইসলামের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘রমিউল জামারাত’। প্রতি বছর লাখো মুসলিম এই আমলের মাধ্যমে ইবলিস শয়তানের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং আল্লাহর প্রতি নিজেদের আনুগত্যের ঘোষণা দেন। কিন্তু কেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে এই পাথর নিক্ষেপ? এর পেছনে রয়েছে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর এক অবিস্মরণীয় ত্যাগের ইতিহাস।
হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ রোকন হলো শয়তানকে পাথর মারা (রমিউল জামারাত)। এই ইবাদতের পেছনে রয়েছে এক মহান ত্যাগের ইতিহাস।
ঐতিহাসিক পটভূমি
শয়তানকে পাথর মারার এই ইতিহাসের সূত্রপাত হয় কয়েক হাজার বছর আগে। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হজরত ইব্রাহিম (আ.) যখন তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার নির্দেশ পান, তখন তিনি তা পালনে মিনার পথে রওনা হন।
ইসলামি ইতিহাস অনুযায়ী, যাত্রাপথে মিনার তিনটি স্থানে শয়তান ‘ইবলিস’ মানুষের বেশ ধরে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে আল্লাহর নির্দেশ পালনে বাধা দিতে এবং বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে। প্রতিবারই শয়তান যখন তাঁকে প্ররোচনা দিচ্ছিল, তখন জিবরাঈল (আ.)-এর পরামর্শে হজরত ইব্রাহিম (আ.) সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করে শয়তানকে বিতাড়িত করেন।
ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই দৃঢ়তা এবং শয়তানের প্ররোচনাকে তুচ্ছ জ্ঞান করার সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই আজ পর্যন্ত হাজিরা মিনায় এই আমলটি পালন করে আসছেন।
পাথর মারার নিয়ম ও সময়
হজের ১০ জিলহজ হাজিরা বড় শয়তানকে (জামারাতুল আকাবাহ) সাতটি পাথর নিক্ষেপ করেন। এরপর ১১ ও ১২ জিলহজ প্রতিদিন ছোট, মেজ ও বড়-তিনটি শয়তানকেই সাতটি করে মোট ২১টি পাথর মারতে হয়। ১৩ জিলহজ পর্যন্ত অবস্থান করলে সেদিনও একইভাবে পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এর গভীর আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে:
১. আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ: এটি করার মাধ্যমে হাজিরা প্রমাণ করেন যে, আল্লাহর নির্দেশের সামনে তারা অন্য কোনো কিছুর পরোয়া করেন না—ঠিক যেমনটি করেছিলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.)।
২. শয়তানের প্রতি ঘৃণা: পাথর মারার মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তি এবং শয়তানি প্ররোচনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন। এটি শয়তানকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করার একটি প্রতীকী প্রক্রিয়া।
৩. সুন্নতের অনুসরণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং পাথর নিক্ষেপ করেছেন এবং এটি পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এটি সরাসরি রাসুল (সা.)-এর সুন্নতের ওপর আমল।
বর্তমান ব্যবস্থাপনা
এক সময় পাথর নিক্ষেপ করতে গিয়ে ভিড়ের কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেও, বর্তমানে সৌদি সরকারের আধুনিক ব্যবস্থাপনায় এটি অনেক সহজ ও নিরাপদ হয়েছে। বিশাল জামারাত কমপ্লেক্সে এখন বহুতল ব্যবস্থার মাধ্যমে হাজিরা স্বাচ্ছন্দ্যে পাথর নিক্ষেপ করতে পারেন।
শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ কেবল একটি পাথর ছোঁড়া নয়, বরং এটি নফসের বিরুদ্ধে জেহাদের প্রতীক। হজের এই শিক্ষা যদি মুমিন তার ব্যক্তিগত জীবনে ধারণ করতে পারে, তবেই ইবলিসের প্ররোচনা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।


