ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মাজার বা পীরের পায়ে সেজদা: ইসলামি শরীয়তের অকাট্য বিধান

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১১:১১ এএম
মাজার বা পীরের পায়ে সেজদা শিরক। ছবি : সংগৃহীত

আমাদের দেশের অনেক মাজার বা পীর-মাশায়েখের দরবারে ভক্তিভরে সেজদা করার দৃশ্য মাঝেমধ্যেই নজরে আসে। ইসলামি বিধি-বিধানে এই বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। একদল মানুষ একে ‘সম্মান’ বা ‘তাজিম’ হিসেবে দেখলেও ইসলামের মূল নীতি এবং কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এর কঠোর ব্যাখ্যা রয়েছে।

সেজদা কেবল আল্লাহর জন্য
ইসলামি আকিদা বা বিশ্বাসের প্রধান ভিত্তি হলো তাওহিদ। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, ইবাদতের উদ্দেশ্যে হোক কিংবা সম্মানের উদ্দেশ্যে-সেজদা পাওয়ার একমাত্র যোগ্য সত্তা মহান আল্লাহ তাআলা।

পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে: “তোমরা সূর্যকে সেজদা করো না, চন্দ্রকেও না; বরং সেজদা করো আল্লাহকে, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করো।” (সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩৭)

সেজদার প্রকারভেদ ও শরিয়তের অবস্থান
ইসলামি ফিকহ বা আইনশাস্ত্র অনুযায়ী সেজদাকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

১. সেজদা-এ-ইবাদত (عبادة): ইবাদতের নিয়তে কাউকে সেজদা করা। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইবাদতের উদ্দেশ্যে সেজদা করা প্রকাশ্য ‘শিরক’। কেউ এমনটি করলে সে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যায়।

২. সেজদা-এ-তাজিমি (تعظيمي): সম্মান প্রদর্শনের জন্য সেজদা করা। পূর্ববর্তী অনেক নবীর যুগে এটি বৈধ থাকলেও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত বা শররিয়তে এটি সম্পূর্ণরূপে হারাম ও কবিরা গুনাহ।

হাদিসের নির্দেশনা
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে মানুষকে সেজদা করতে নিষেধ করেছেন। হযরত কায়েস ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবীজিকে (সা.) বললাম যে, হিরাবাসীদের দেখেছি তারা তাদের সর্দারদের সেজদা করে। আপনি তো সেজদা পাওয়ার অধিক যোগ্য। তখন নবীজি (সা.) বললেন:

“তুমি কি মনে করো, আমার কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তুমি কি সেজদা করবে?” আমি বললাম, না। তখন তিনি বললেন,  “সুতরাং তোমরা তা করো না। যদি আমি কাউকে সেজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে নারীদের নির্দেশ দিতাম তাদের স্বামীদের সেজদা করতে।” (সুনানে আবু দাউদ)

অন্য এক হাদিসে নবীজি (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, “আল্লাহর অভিশাপ ইহুদি ও নাসারাদের ওপর, তারা তাদের নবীদের কবরকে সেজদার জায়গায় (মসজিদ) পরিণত করেছে।” (সহিহ বুখারি)

মাজার বা কবরে সেজদার কুফল
মাজার বা পীরের পায়ে সেজদা করা কেবল শরিয়ত পরিপন্থীই নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের মনে শিরক বা আল্লাহর অংশীদার সাব্যস্ত করার বীজ বপন করে। আলেমদের মতে:

এটি তাওহিদের পরিপন্থী একটি কাজ। এর মাধ্যমে মাজার কেন্দ্রিক ব্যবসা ও কুসংস্কারের প্রসার ঘটে। এটি মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মানের বদলে তার আত্মার কষ্টের কারণ হতে পারে, যদি তা ইসলামি নীতির বাইরে হয়।

আলেমদের পরামর্শ
দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম ও মুফতিদের মতে, পীর বা ওলি-আউলিয়াদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থাকা ঈমানের অংশ, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন কোনোভাবেই ইবাদতের পর্যায়ে না পৌঁছে। পীর বা মুরুব্বিদের সাথে মুসাফাহা (হাত মেলানো) বা কদমবুসি (পায়ে হাত দেওয়া নয়, বরং পায়ের কাছে হাত নিয়ে সম্মান জানানো) নিয়ে মতভেদ থাকলেও, সেজদা করা সর্বসম্মতিক্রমে নিষিদ্ধ।

ইসলামি বিধান অনুযায়ী, মাথা নত করার একমাত্র জায়গা হলো আল্লাহর ঘর বা জায়নামাজ। পীর বা আউলিয়াদের দেখানো পথে চলে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই একজন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। মাজার বা কোনো মানুষের পায়ে সেজদা করা ইসলামি ঐতিহ্যের অংশ নয়, বরং এটি একটি গর্হিত কাজ যা বর্জন করা আবশ্যক