ভাঙা আঙুলে মোটা ব্যান্ডেজ। মুখে যন্ত্রণা লুকানোর চেষ্টা। চিকিৎসকের শেষ সতর্কবার্তা তখনো কানে বাজছে— ‘আরেকটা বল লাগলে এখানেই ক্যারিয়ার শেষ।’ তারপরও ব্যাট হাতে মাঠে নামলেন তিনি। কারণ তখন মাঠে বাংলাদেশ, ড্রেসিংরুমে অসহায় সতীর্থরা। সে মানুষটির নাম তামিম ইকবাল খান।
সেই তামিম ইকবালকেই বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের এক দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক প্রকাশ্যে আখ্যা দিয়েছেন ‘ভারতীয় দালাল’ বলে। এই শব্দ শুধু একজন ক্রিকেটারকে নয়, পুরো বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
তামিম ইকবালের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু ২০০৭ সালে। বয়স তখন মাত্র ১৭। একই বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে সাহসী ব্যাটিং, বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন এক যুগের সূচনা করে। সেই থেকে প্রায় ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
তামিম ইকবালের আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান (সংক্ষেপে)
ওয়ানডে:
ম্যাচ: ২৪৩
রান: ৮,৩৫৭
সেঞ্চুরি: ১৪
ফিফটি: ৫৬
টেস্ট:
ম্যাচ: ৭০
রান: ৫,১৩৪
সেঞ্চুরি: ১০
ফিফটি: ৩১
টি–টোয়েন্টি:
ম্যাচ: ৭৮
রান: ১,৭৫৮
তামিম তিন সংস্করণ মিলিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের একজন। এবং একমাত্র বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান যিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২৫টির বেশি শতক করেছেন। এই রেকর্ডগুলো কোনো বোর্ডের দানে আসেনি। এসেছে বছরের পর বছর ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে।
এছাড়াও তামিম ইকবাল ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক একজন অধিনায়ক। কঠিন সময়েও যিনি মাঠ ছাড়েননি। ইনজুরি, ফর্মহীনতা, সমালোচনা—সব সামলে সামনে থেকেছেন।
২০১৮ সালের এশিয়া কাপের সেই ইনিংস শুধু আবেগ নয়—এটা ছিল নেতৃত্বের চূড়ান্ত উদাহরণ। ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলে দলের প্রয়োজনে মাঠে নামা, এমন ঘটনা বিশ্ব ক্রিকেটেও বিরল।
ক্রিকেট ছাড়ার পরও দায়িত্বশীল কণ্ঠ
অবসর পরবর্তী সময়ে তামিম ইকবাল কখনো বোর্ডের বিরুদ্ধে খারাপ ভাষা ব্যবহার করেননি। তিনি কোনো দেশের পক্ষে লবিং করেননি। তিনি শুধু ক্রিকেট নিয়ে কথা বলেছেন।
গত ৮ জানুয়ারি তার বক্তব্য ছিল পরিষ্কার— মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ায় বিসিবি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলবে না।
এমন প্রেক্ষাপটে তামিম ইকবাল বলেছেন, সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান এবং ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে। সবকিছু জনসাধারণের আবেগ দিয়ে চিন্তা করলে বড় সংস্থা চালানো যায় না। আপনার আজকের সিদ্ধান্ত আগামী ১০ বছর পর কী প্রভাব ফেলবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এবং খেলোয়াড়দের জন্য কোনটা ভালো হবে, সব চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’ এ বক্তব্য কী অযৌক্তিক?
ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড—সব বড় বোর্ডই কাজ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়। তামিম সেই একই বাস্তবতার কথাই বলেছেন।
এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিসিবির পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম প্রকাশ্যে তামিম ইকবালকে ‘ভারতীয় দালাল’ বলে মন্তব্য করেন—যার কোনো প্রমাণ, ব্যাখ্যা বা প্রেক্ষাপট নেই। একজন পরিচালক যখন এমন মন্তব্য করেন, তখন তিনি ব্যক্তিগত কেউ নন—তিনি বোর্ডের প্রতিনিধি। এবং এখানেই আসে বিসিবির সবচেয়ে দুর্বল অধ্যায়।
এমন কাণ্ডে বিসিবির দায় এড়ানোর কৌশল!ঘটনার পর বিসিবি সভাপতির বক্তব্য— ‘এটা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়।’ এই বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তোলে— বিসিবির পরিচালক কি বোর্ডের বাইরে কথা বলেন? দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ ভুল করলে বোর্ড কি দায় নেবে না?
তাহলে বোর্ডের নৈতিক দায়িত্ব কোথায়? যে বোর্ড নিজের পরিচালকের বক্তব্যের দায় নিতে চায় না, সে বোর্ড কীভাবে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার, ভবিষ্যৎ ও মর্যাদার দায়িত্ব নেবে?
তামিম ইকবাল আজ কোনো ব্যক্তি নন—তিনি একটি অধ্যায়। এই অধ্যায়কে ‘দালাল’ বলে চিহ্নিত করা মানে— বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোকেই অস্বীকার করা। আজ যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলা অপরাধ হয়, আজ যদি সাবেক অধিনায়কের মতামত দেশদ্রোহিতা হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম কথা বলবে কোথায়?

