বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) চলমান অস্থিরতা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। জাতীয় দলের একাধিক ক্রিকেটারের সঙ্গে বুধবার মধ্যরাতে দীর্ঘ বৈঠকে বসেও পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হন বিসিবির তিন পরিচালক। বৈঠক শেষে ক্রিকেটারদের অবস্থান ছিল একদম পরিষ্কার—বিসিবি পরিচালক ও অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান এম নাজমুল ইসলামের পদত্যাগ ছাড়া কোনো সমঝোতা নয়।
মধ্যরাতের অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় দলের ক্রিকেটার মোহাম্মদ মিঠুন, অধিনায়ক শান্ত, সোহানসহ কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটার। বোর্ড ও ক্রিকেটারদের মধ্যকার চলমান টানাপোড়েন নিরসনের উদ্দেশ্যেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিসিবি পরিচালক ও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান ক্রিকেটারদের জানান, পরিচালক নাজমুলকে দ্রুতই ‘ওএসডি’ করা হবে এবং এই সিদ্ধান্তে অন্য সব বোর্ড পরিচালকরা একমত বলেও জানান তিনি। কিন্তু তাকে পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গঠনতান্ত্রিক জটিলতার কথা তুলে ধরেন ইফতিখার। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনা, ব্যাখ্যা ও আশ্বাস—কোনোটাই ক্রিকেটারদের অবস্থান টলাতে পারেনি।
ক্রিকেটারদের মতে, এম নাজমুল ইসলামের সঙ্গে এই বিরোধ কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই তার একের পর এক মন্তব্য জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের মধ্যে ক্ষোভ ও অপমানবোধ তৈরি করে আসছিল। গণমাধ্যমে এবং বোর্ডের ভেতরে দেওয়া তার বক্তব্যগুলো ক্রিকেটারদের সম্মান ও জাতীয় দলের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে অভিযোগ তাদের।
বিশেষ করে সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে এম নাজমুল ইসলামের আগের মন্তব্য ক্রিকেট অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তামিমকে ঘিরে ‘ভারতের দালাল’—এ ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য ক্রিকেটারদের কাছে ছিল সীমা লঙ্ঘনের শামিল। তাদের ভাষায়, একজন বিসিবি পরিচালক যদি জাতীয় দলের আইকনদের নিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করেন, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, পুরো দলের জন্যই অপমানজনক।
এরই মধ্যে বুধবার ১৪ জানুয়ারি দেওয়া একটি মন্তব্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি বিস্ফোরণের দিকে যায়। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে এম নাজমুল ইসলাম বলেন— বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললেও বোর্ডের কোনো লস নেই, খেললেও তেমন লাভ নেই।
এই বক্তব্য ক্রিকেটারদের কাছে চূড়ান্ত অবজ্ঞার প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের মতে, বিশ্বকাপ দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ মঞ্চ—সেখানে জাতীয় দলের অংশগ্রহণকে লাভ–লোকসানের অঙ্কে নামিয়ে আনা ক্রিকেটের আত্মাকেই অস্বীকার করার নামান্তর।
এরই ধারাবাহিকতায় টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশের ভারতে যাওয়া নিয়ে চলমান টানাপোড়েনের প্রসঙ্গেও বিতর্কিত মন্তব্য করেন তিনি। বিশ্বকাপে না গেলে ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে প্রশ্নের উত্তরে অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান বলেন— ওরা গিয়ে যদি কিছুই না করতে পারে, তাহলে ওদের পেছনে আমরা যে এত কোটি কোটি টাকা খরচ করছি, আমরা কি ওদের কাছ থেকে ওই টাকা ফেরত চাচ্ছি নাকি! এমন বক্তব্য ক্রিকেটারদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
জানা গেছে, বৈঠকে বিসিবির পরিচালকরা ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্য এড়িয়ে চলার আশ্বাস দেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে ক্রিকেটাররা স্পষ্ট জানিয়ে দেন—এ ধরনের আশ্বাসে আর কোনো আস্থা নেই।
জাতীয় দলের একাধিক ক্রিকেটার বলেন, বারবার আমাদের ছোট করা হয়েছে। ক্রিকেট না বুঝে, ক্রিকেটের সম্মান না রেখে কেউ বোর্ডে থাকলে সেটা মেনে নেওয়া যায় না।
এর আগে বুধবার রাতেই এম নাজমুল ইসলামকে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন ক্রিকেটাররা। পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয় যখন বৃহস্পতিবার ১৫ জানুয়ারি বিপিএলের ম্যাচের আগে পদত্যাগ না করলে সব ধরনের ক্রিকেট বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব।
কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন বলেন, উনি যেভাবে আমাদের সব ক্রিকেটারকে নিয়ে মন্তব্য করেছেন, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি আগামীকাল ম্যাচের আগে উনি পদত্যাগ না করেন, তাহলে আমরা সব ধরনের ক্রিকেট বয়কট করব।


