ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

১৯৭০ বিশ্বকাপের সেই অন্যরকম ‘পেলে’

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ০১:০০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

ফুটবল মানেই গোল। আর গোল মানেই সাফল্য। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমন একজন জাদুকর আছেন, যিনি গোল না করেও ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো তৈরি করেছিলেন। তিনি আর কেউ নন—ফুটবল সম্রাট পেলে। 

১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ছিল পেলের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ এবং ব্রাজিলের তৃতীয় শিরোপা জয়ের গল্প। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, সেই আসরে পেলের করা ৪টি গোলের চেয়েও ফুটবল বিশ্ব আজ বেশি মনে রেখেছে তার ৩টি ‘ব্যর্থ’ প্রচেষ্টাকে!

পেলের সেই ‘অসম্পূর্ণ’ শ্রেষ্ঠত্বের গল্প নিয়েই আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন.....

মাঝমাঠ থেকে সেই দুঃসাহসী শট 

ম্যাচ তখন ১-১ সমতায়। মাঝমাঠে বল পেয়েই পেলে লক্ষ্য করলেন চেক গোলরক্ষক আইভো ভিক্টর গোললাইন থেকে বেশ খানিকটা সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো চিন্তা না করেই নিজের অর্ধ থেকে প্রায় ৫০ গজ দূর থেকে এক অবিশ্বাস্য লব করলেন পেলে। 

বলটি যখন হাওয়ায় ভাসছে, তখন পুরো গ্যালারি রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে। গোলরক্ষক ভিক্টর পাগলের মতো পেছনে ছুটছেন। শেষ মুহূর্তে বলটি পোস্টের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূর দিয়ে বাইরে চলে যায়। গোল হয়নি ঠিকই, কিন্তু ধারাভাষ্যকারের সেই চিৎকার— ‘Pele, Pele... almost!’ আজও ফুটবলপ্রেমীদের কানে বাজে।

গর্ডন ব্যাঙ্কসের অমরত্ব আর পেলের ‘হতাশা’

ফুটবল ইতিহাসে বলা হয়, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যদি পেলের সেই হেডটি গোল হতো, তবে সেটি হতো বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল। কিন্তু সেই বলটি গর্ডন ব্যাঙ্কস যেভাবে সেভ করেছিলেন, তা এখন ‘সেভ অফ দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে পরিচিত। 

পেলের সেই বুলেট গতির নিচের দিকের হেডটি সেভ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। পেলে গোল পাননি, কিন্তু সেই মুহূর্তটি তাকে এবং ব্যাঙ্কস দুজনকেই ইতিহাসের পাতায় অমর করে দিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, পেলে গোল না করেও একটি গোলরক্ষককে সর্বকালের সেরাদের কাতারে নিয়ে এসেছিলেন।

সেই জাদুকরি ‘ডামি’

সেমিফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে পেলে যা করেছিলেন, তা আজও বিশ্বের যেকোনো ফুটবল একাডেমিতে শেখানো হয়। তোস্তাওয়ের দেওয়া থ্রু পাসটি যখন পেলের দিকে আসছিল, গোলরক্ষক মাজুরকিউইচ এগিয়ে আসছিলেন বলটি ধরতে। পেলে বলটি স্পর্শ না করেই শরীরের এক ঝটকায় বলটিকে অন্যদিকে যেতে দিলেন এবং নিজে অন্য পাশ দিয়ে ঘুরে বলের নিয়ন্ত্রণ নিলেন।

গোলরক্ষক তখন সম্পূর্ণ বোকা বনে গিয়ে উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে! যদিও পেলের শটটি গোলপোস্টের বাইরে দিয়ে যায়, কিন্তু এই ‘ডামি’ মুভটি আজও ফুটবলের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে সুন্দর মিস’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

ফাইনালের সেই ‘নো-লুক’ পাস

ইতালির বিপক্ষে ফাইনালের চতুর্থ গোলটি ছিল আধুনিক ফুটবলের এক নিখুঁত উদাহরণ। পেলে বলটি ধরে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন, এবং না তাকিয়েই ডান দিকে একটি হালকা পাস দিলেন। ঠিক যেন পেলের পিঠেও চোখ ছিল! 

তিনি জানতেন কার্লোস আলবার্তো ঝড়ের গতিতে ওভারল্যাপ করে আসছেন। আলবার্তোর সেই গোলটি ছিল ব্রাজিলের দলীয় ফুটবলের চূড়ান্ত প্রদর্শনী, যার কারিগর ছিলেন পেলে।

কেন ১৯৭০-এর পেলে আলাদা?

সত্তর দশকের সেই মেক্সিকো বিশ্বকাপে পেলে কেবল একজন স্ট্রাইকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী। তার সেই ‘মিস’গুলো প্রমাণ করে যে ফুটবল কেবল পরিসংখ্যান বা গোলের খেলা নয়, এটি সৃজনশীলতা আর সাহসেরও খেলা। 

১৯৭০-এর পেলে আমাদের শিখিয়েছেন যে, কখনো কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট শটও গোললাইনের ভেতর যাওয়া বলের চেয়ে বেশি সৌন্দর্য ছড়াতে পারে।