ইংল্যান্ডের উত্তর উপকূলে অবস্থিত হুইটবি শহর। একদিকে বিশাল সমুদ্র, অন্যদিকে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন মঠ। এই মঠ পর্যন্ত পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় ১৯৯টি খাড়া সিঁড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি কেবল পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের এক প্রতীক।
সম্প্রতি ইংল্যান্ডের তারকা নারী ফুটবলার বেথ মিড তার শৈশব, মা-বাবার ত্যাগ এবং সাফল্যের নেপথ্যের গল্প বলতে গিয়ে এই ১৯৯টি সিঁড়িকেই জীবনের রূপক হিসেবে তুলে ধরেছেন।
গল্পের শুরুটা আশির দশকের মাঝামাঝি। হুইটবির বিখ্যাত ‘বোথাম’স বেকারি’তে রাতের শিফটে কাজ করতেন তার বাবা। ভোররাতের দিকে যখন তার মা নাইটক্লাবের কাজ শেষ করে ফিরতেন, তখন বেকারির কাচের জানালার ওপাশ থেকে ময়দা মাখা পোশাকে বাবা তাকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাতেন।
১৯৮৬ সালে সনিটনের এক ডিসকোতে নাচতে গিয়ে তাদের যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল, তা স্থায়ী হয়েছিল দীর্ঘ ৩৭ বছর। সেই দম্পতির ঘর আলো করেই জন্ম নেন এই তারকা ফুটবলার।
রানসউইক বে-র একটি ছোট্ট বাড়িতে বেড়ে ওঠা বেথ মিডের শৈশব ছিল কল্পনার রঙে মাখানো। মধ্যবিত্ত সংসারে অভাব থাকলেও মা কখনো তা বুঝতে দেননি।
তিনি বলতেন, তুমি লক্ষ্মী হয়ে থাকলে পরীরা তোমাকে উপহার দিয়ে যাবে। স্কুল থেকে ফিরে বিছানায় পছন্দের পোকেমন কার্ড বা ফুটবল কার্ড খুঁজে পেতেন তিনি। এমনকি বড়দিনের সময় বিস্ময়করভাবে তার ঘরে পৌঁছে যেত পছন্দের বাঙ্ক-বেড।
বড় হয়ে তিনি বুঝতে পারেন, সেই ‘পরী’ আসলে ছিলেন তার মা, যিনি নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও সন্তানের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন।
হুইটবির মতো ছোট শহরে মেয়েদের ফুটবল খেলার পরিবেশ তখন ছিল না বললেই চলে। জং ধরা গোলপোস্ট আর রাস্তার দেয়ালে ক্রসবার এঁকে চলত প্র্যাকটিস। একটি পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, ফুলের সাজে সজ্জিতা ‘ফ্লাওয়ার গার্ল’ হয়েও তিনি থাকতে পারেননি ফুটবল ছাড়া।
পায়ে ফোস্কা পড়ায় মাঝ অনুষ্ঠান থেকেই বাবার মাধ্যমে নিজের প্রিয় নিয়ন সবুজ ফুটবল বুট আনিয়ে নিয়েছিলেন। সুন্দর ফ্রকের নিচে ফুটবল বুট পরা সেই ছোট্ট মেয়েটিই বিশ্বমঞ্চে ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
পেশাদার ফুটবলার হওয়ার পথটি সহজ ছিল না। বাবার পুরোনো সিট্রোয়েন গাড়িতে চড়ে শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে ম্যাচ খেলতে যেতে হতো তাদের। পেট্রোলের টাকা জোগাতে এবং সংসারের হাল ধরতে তার মা স্কুলের চাকরির পাশাপাশি রাতের বেলা সমুদ্রের ধারের এক পাবে অতিরিক্ত কাজ করতেন।
বাবা যখন রাতে তাকে নিয়ে হাঁটতে বেরোতেন, সেই পাবের জানালার বাইরে দিয়ে যাওয়ার সময় মা সবসময় এক গাল হাসি নিয়ে জানালার ওপাশ থেকে হাত নাড়তেন।
সেই ফুটবলারের মতে, জীবনের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার মা-বাবার সীমাহীন পরিশ্রম ও সততা। আজ যখন তিনি হুইটবির সেই ১৯৯টি সিঁড়ির দিকে তাকান, তিনি সেখানে কেবল পাথর দেখতে পান না; বরং দেখতে পান তার মা-বাবার ভালোবাসা আর ত্যাগের প্রতিটি ধাপ।
বেথ মিডের ভাষায়, তারা আমাকে ফুটবলার বানানোর জন্য এসব করেননি, করেছিলেন কারণ আমি ফুটবল ভালোবাসতাম আর তারা আমাকে ভালোবাসতেন।



