ইংল্যান্ডের ওয়েলসে পুলিশি তল্লাশির ক্ষেত্রে ভয়াবহ বর্ণবৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শ্বেতাঙ্গ শিশুদের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের নগ্ন করে তল্লাশি বা ‘স্ট্রিপ-সার্চ’ করার হার প্রায় আট গুণ বেশি।
চিলড্রেন’স কমিশনার ডেম র্যাচেল ডি সুজা এই তথ্য প্রকাশ করে জানিয়েছেন, শিশুদের ক্ষেত্রে পুলিশের বলপ্রয়োগ এবং তল্লাশির এই প্রবণতা দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে মোট ৩৬২ জন শিশুকে নগ্ন করে তল্লাশি করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ৩১ শতাংশই কৃষ্ণাঙ্গ শিশু, যা তাদের জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত বেশি।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একজন শ্বেতাঙ্গ শিশুর তুলনায় একজন কৃষ্ণাঙ্গ শিশুর এই ধরনের অমর্যাদাকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা আট গুণ এবং এশীয় শিশুদের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি।
এ বিষয়ে কমিশনার র্যাচেল ডি সুজা অভিযোগ করেছেন, কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রায়ই ‘অ্যাডাল্টিফিকেশন’ বা তাদের বয়সের তুলনায় বড় এবং প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখার মানসিকতা পোষণ করে।
তল্লাশির সময় বলপ্রয়োগের কারণ হিসেবে প্রায়ই শিশুদের ‘শারীরিক গঠন’ বা ‘বিশাল দেহ’কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অথচ শ্বেতাঙ্গ শিশুদের ক্ষেত্রে পুলিশ অনেক বেশি নমনীয় থাকে এবং প্রয়োজনে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়।
এই চাঞ্চল্যকর তথ্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন কয়েক বছর আগে ‘চাইল্ড কিউ’ নামক এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরীকে স্কুলে ঋতুস্রাব চলাকালীন নগ্ন করে তল্লাশির ঘটনায় উত্তাল হয়েছিল ব্রিটেন। সেই ঘটনায় জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করা হলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি বলে জানায় কৃষ্ণাঙ্গরা।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাদক বা অবৈধ বস্তুর সন্ধানে এই ‘স্ট্রিপ-সার্চ’ চালানো হয়। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই তল্লাশিতে কিছুই পাওয়া যায় না এবং কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
কমিশনার জানান, কোনো যৌক্তিক প্রমাণ ছাড়াই কেবল সন্দেহের বশে শিশুদের ওপর এমন ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা শিশুদের সুরক্ষা আইনের পরিপন্থী।
পুলিশের এই আচরণের তীব্র সমালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে এবং সাধারণ মানুষের চোখের সামনেই শিশুদের নগ্ন করে তল্লাশি করা হয়েছে। এছাড়া ৩০ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের আগে অন্তত একবার এমন তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
কমিশনার ডি সুজা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, শিশুদের প্রথমত শিশু হিসেবেই দেখতে হবে; তাদের গায়ের রঙের ভিত্তিতে বিচার করার কোনো সুযোগ নেই।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে জানিয়েছে, তারা শিশুদের তল্লাশির ক্ষেত্রে নতুন সুরক্ষা নীতিমালা এবং পুলিশি ব্যবস্থায় সংস্কার আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা বর্ণবাদী বৈষম্য কমাতে কাজ করছে, তবে অপরাধ দমনে অনেক সময় এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

