ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

বালেন্দ্র শাহ’র পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল কাঠমান্ডু, ২ জনের মৃত্যু

বিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০২:৪৯ এএম
ছবি : সংগৃহীত

নেপালে আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতার আভাস দেখা দিয়েছে। নতুন নির্বাচিত সরকারের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই রাজধানী কাঠমান্ডুসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের পদত্যাগের দাবিতে ফের রাজপথে নেমেছে তরুণ প্রজন্ম। গত তিন দিনে চলমান আন্দোলনের মধ্যে তিনজন বিক্ষোভকারী গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে আত্মাহত্যার চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্য আরেকজন গুরুতর আহত অবস্থায় কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

জেন-জির আন্দোলনের জেরে ২০২৫ সালের ৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী হন কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তরুণদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয় কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (সিপিএন) নেতৃত্বাধীন কেপি শর্মা ওলির সরকার।

বালেন্দ্র শাহের বিজয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল দেশের তরুণ সমাজ। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় সেই তরুণরাই এখন তার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

গত বুধবার শুরু হওয়া জেন জেড আন্দোলন দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে। কাঠমান্ডুর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রোববার বিক্ষোভকারীরা রাজধানীর প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র সিং দরবারের দিকে মিছিল নিয়ে গেলে ‘বালেন্দ্র শাহ পদত্যাগ করো’ এবং ‘স্বৈরাচারী শাসন চলবে না’—এমন স্লোগান দিতে দেখা যায়।

কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালে অবৈধ হকার উচ্ছেদ ও বস্তি অপসারণ নিয়ে বালেন্দ্র শাহের বিতর্কিত ভূমিকা ছিল। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি একই ধরনের কঠোর নীতি দেশজুড়ে বাস্তবায়ন করছেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।

একজন ছাত্রনেতা বলেন, ‘নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকে বালেন্দ্র শাহ জনগণের মৌলিক সমস্যা ও কর্মসংস্থানের সংকট সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও একনায়কতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠায় বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলকামান, টিয়ার গ্যাস ও বিপুলসংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনীকেও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। কাঠমান্ডু পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কয়েকটি এলাকায় সব ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে।

চরম বেকারত্ব, দুর্নীতি ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে গত বছর জেন জেড আন্দোলনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তন হলেও এসব সমস্যার সমাধান না হওয়ায় তরুণদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। সে সময় পেশায় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ও শখের র‌্যাপার বালেন্দ্র শাহ তরুণদের কাছে পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তার গানও আন্দোলনকারীদের অনুপ্রাণিত করেছিল।

দুর্নীতিমুক্ত নেপাল গঠন, বেকারত্ব কমানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে বালেন্দ্র সরকার। তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকার এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে যাকে এক বছর আগে দেশের আশা-ভরসার প্রতীক হিসেবে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল, আজ তারই পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল রাজধানী কাঠমান্ডু।

‘জেন জেড নেপাল’ নামে আন্দোলনকারী সংগঠনের অভিযোগ, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী জনবিরোধী ও স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছেন। সংগঠনটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, সরকার নীতিগত পরিবর্তন না আনলে সারা দেশে আরও বড় আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তরুণদের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়াতে চলতি বাজেটেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে চলমান আন্দোলনের মধ্যে তিন তরুণ আত্মাহুতির চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু এবং একজনের সংকটাপন্ন অবস্থা দেশজুড়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানী কাঠমান্ডুর পরিস্থিতিও থমথমে।

এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সক্রিয়তাও বর্তমান সরকারের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তার দল আন্দোলনরত তরুণদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বালেন্দ্র শাহ সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে। তিন তরুণের আত্মাহুতির চেষ্টার পেছনে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছেন কেপি শর্মা ওলি।