ঢাকা রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

কয়েক মাসের শান্তির পর ফের অশান্ত মণিপুর

বিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

কয়েক মাস তুলনামূলক শান্ত থাকার পর মণিপুরে নতুন করে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিম ইম্ফল জেলার কান্তো সবল গ্রামে মেইতেই সম্প্রদায়ের সদস্যদের বেশ কয়েকটি পরিত্যক্ত বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এতে রাজ্যের ভঙ্গুর শান্তি আবারও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ঘটনার পর দ্রুত এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করে। কর্মকর্তারা জানান, সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়ায় ঘটনাটি বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারেনি। অগ্নিসংযোগ ও গণহিংসার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে।

মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী যুমনাম খেমচাঁদ সিং ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া দুই অভিযুক্তের একজনের পরিচয় কাম্মাং লৌভুম হিসেবে জানা গেছে। তিনি হেংজাং গ্রামের প্রধান এবং লেইমাখং এলাকা সুরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রশাসন দ্রুত ভিড় নিয়ন্ত্রণ করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মণিপুর পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ) মোতায়েন করে পরিস্থিতি সামাল দেয়।

তিনি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

মুখ্যমন্ত্রী সিং বলেন, দীর্ঘ সময় শান্ত থাকার পর এই ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক। তাঁর দাবি, মণিপুরে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করার জন্য কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।

সরকার জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তারা সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

পুলিশ জানিয়েছে, বাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনার পর প্রায় ৬০০ জন নারী-পুরুষ কান্তো সবল গ্রামের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের গ্রামে প্রবেশে বাধা দেয়।

একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর এই পদক্ষেপের কারণে সম্ভাব্য বড় সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, কিছু দুষ্কৃতকারী আরও কয়েকটি পরিত্যক্ত বাড়িতে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছিল। তবে নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে তা প্রতিহত করে।

কর্তৃপক্ষের দাবি, এই ঘটনায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।

অগ্নিসংযোগ ও গণহিংসার অভিযোগে পুলিশ মামলা দায়ের করেছে। কান্তো সবল ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

পরিস্থিতি শান্ত রাখতে এবং নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।

বাড়িগুলোতে আগুন লাগার পর আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়া দেখতে পেয়ে মেইতেই ও নাগা সম্প্রদায়ের শত শত মানুষ ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে যান।

অনেকে আগুন নেভাতে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তবে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করেন, যাতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না হয়ে ওঠে।

ভিড় নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করে।

কিছু স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, কাছাকাছি নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও হামলাকারীরা কীভাবে বাড়িগুলোতে আগুন লাগাতে সক্ষম হলো তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তাদের অভিযোগ, পরিত্যক্ত বাড়িগুলো রক্ষা করতে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি সংবেদনশীল এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ইম্ফল পশ্চিম জেলার সীমান্তবর্তী কাংপোকপি জেলার পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকা থেকে একদল লোক কান্তো সবলে প্রবেশ করে।

তাদের অভিযোগ, হামলাকারীরা পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে এসে ইচ্ছাকৃতভাবে মেইতেই পরিবারগুলোর পরিত্যক্ত বাড়িগুলোকে লক্ষ্য করে আগুন ধরিয়ে দেয়।

২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুরে জাতিগত সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই এসব বাড়ি পরিত্যক্ত ছিল। সহিংসতার কারণে বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।

ইম্ফল উপত্যকার প্রান্তে অবস্থিত কান্তো সবল এবং কুকি-সংখ্যাগরিষ্ঠ কাংপোকপি জেলার সীমান্তবর্তী হওয়ায় এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত।

অগ্নিসংযোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আশপাশের গ্রাম থেকে আরও মানুষ কান্তো সবলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তা বাহিনী তাদের বাধা দিলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বাহিনীর উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

কর্মকর্তারা জানান, দিনভর উত্তেজনা থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল।