সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববাজারে সোনার দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। মাঝেমধ্যে স্বল্পমেয়াদি উত্থান-পতন দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২০ সালে প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৮৫ মার্কিন ডলার। বর্তমানে তা ৪ হাজার ৫০০ ডলারের বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৮ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে।
কেন বাড়ছে সোনার দাম?
অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। সাধারণভাবে সুদের হার বেশি থাকলে সঞ্চয়ের মাধ্যমে অর্থের মূল্য বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে তুলনামূলকভাবে নিম্ন সুদের হার এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে চাহিদা বাড়ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে দামে।
ডয়চে ব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, চীন, রাশিয়া, ভারত, তুরস্কসহ বিভিন্ন উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ধারাবাহিকভাবে তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে।
গত ২৭ এপ্রিল প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৮ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমান মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ।
ল্যান্ডেসব্যাংক বাডেন-ভুর্টেমবের্গ (এলবিবিডব্লিউ)-এর মূল্যবান ধাতু বিশেষজ্ঞ ফ্রাঙ্ক শ্যালেনবার্গার বলেন, সোনার দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা, মার্কিন ডলারের দুর্বলতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জোরালো ক্রয় এবং সোনার বার ও মুদ্রার উচ্চ চাহিদা।
তিনি আরও বলেন, ক্রিপ্টোকারেন্সিও এখন বিনিয়োগকারীদের সম্পদ বৈচিত্র্যকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অনেক বিনিয়োগকারী একই সঙ্গে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও সোনায় বিনিয়োগ করছেন, যা সোনার বাজারে নতুন ধরনের চাহিদা তৈরি করেছে।
ডয়চে ব্যাংক রিসার্চের মূল্যবান ধাতু বিশ্লেষক মাইকেল শুয়েহের মতে, বর্তমানে বাজারে দুটি ধরনের ক্রেতা রয়েছে—‘অস্থিতিস্থাপক’ এবং ‘স্থিতিস্থাপক’। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো বড় ও দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতারা মূল্য পরিবর্তনে খুব বেশি প্রভাবিত হন না। অন্যদিকে, গহনা ক্রেতা ও সাধারণ ভোক্তারা দাম বাড়লে কেনাকাটা কমিয়ে দেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থায়ী চাহিদাই সোনার বাজারকে শক্তিশালী করেছে।
লন্ডনের বাজারে সোনা ও রুপার দরপতন
দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যেই বৃহস্পতিবার লন্ডনের বুলিয়ন বাজারে সোনা ও রুপার দামে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশ্র অর্থনৈতিক তথ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং অপরিশোধিত তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সুদের হার নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
লন্ডনের মধ্যাহ্ন নিলামে রুপার দাম প্রতি ট্রয় আউন্সে ১.৫০ ডলার কমে প্রায় ৫৬.৪৫ ডলারে নেমে আসে, যা গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরে স্পট মার্কেটেও এর দাম আরও প্রায় ১ ডলার কমে যায়।
অন্যদিকে, সোনার দামও বুধবারের তুলনায় ১.৬ শতাংশ কমে লন্ডনের বিকেলের বেঞ্চমার্কে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে। প্রতি আউন্সের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৯৯৫ ডলার, যা নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন।
বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ফিডেলিটির মাল্টি-অ্যাসেট পোর্টফোলিও টিমের স্যামসন ইয়ান জানান, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সোনার দাম ৫ হাজার ডলারের বেশি থাকায় প্রতিষ্ঠানটি তাদের অবস্থান ‘নিউট্রাল’ পর্যায়ে নামিয়েছিল। তবে বর্তমান দরপতনের পর আবারও সোনায় ‘ওভারওয়েট’ অবস্থানে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তার ভাষায়, “প্রশ্ন হলো—কখন।”
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাব
হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানগামী একটি তেলবাহী জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর হামলার পর বিশ্ববাজারে সোনা, রুপা, শেয়ার এবং সরকারি বন্ডের দামে একযোগে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে মার্কিন ডলারও এক মাসের সর্বনিম্ন অবস্থান থেকে কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে।
এদিকে, ইয়েমেনে নতুন হামলার পর ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে তারা পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করেছে। একই সঙ্গে হামাস পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সময়ে ইউক্রেনের হামলার কারণে রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির তেল কোম্পানিগুলো ভারতকে গ্যাসোলিন সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।
তেলের দাম ও মার্কিন অর্থনীতি
বিশ্ববাজারে টানা চতুর্থ দিনের মতো অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। মার্কিন WTI অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার অতিক্রম করেছে, যা জুনের পর প্রথম।
সর্বশেষ অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গত মাসে খুচরা বিক্রি ০.২ শতাংশ বেড়েছে। তবে বাড়ি কেনার আবেদন ৫.৪ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে নতুন ও চলমান উভয় ধরনের বেকার ভাতার আবেদনও হ্রাস পেয়েছে।
সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশা
অস্ট্রেলিয়ান ব্যাংক ANZ-এর বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে সোনা ও রুপার দাম একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই ওঠানামা করতে পারে। কারণ বাজারে এখনো ধারণা রয়েছে, চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ অন্তত একবার সুদের হার বাড়াতে পারে।
সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শেষ নাগাদ মার্কিন সুদের হার ৩.৯০ শতাংশের ওপরে থাকতে পারে। বাজারের প্রত্যাশা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষের আগে ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণী কমিটি (FOMC) সুদের হার আরও ০.২৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়াতে পারে।

