ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

বেলুচিস্তান স্বাধীন হলে পাকিস্তানের নাম কী হবে?

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

সময়টা ১৯৪৮ সাল। ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে একটি নতুন মুসলিম রাষ্ট্র—পাকিস্তান। কিন্তু রাষ্ট্রটির নাম কেন ‘পাকিস্তান’ রাখা হয়েছিল? কোথা থেকেই বা এলো এই নামের ধারণা? সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে- যদি কোনো দিন বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যায়, তাহলে কি পাকিস্তানের নামও বদলে যাবে?

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ‘পাকিস্তান’ নামটি প্রথম ব্যবহার করেন মুসলিম ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চৌধুরী রহমত আলী। তিনি ১৯৩৩ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘এখন অথবা কখনো নয়; আমরা কি চিরদিন বাঁচব, নাকি চিরতরে বিলীন হয়ে যাব?’ শীর্ষক একটি পুস্তিকায় প্রথম এই নামের প্রস্তাব দেন। তখন নামটির বানানে বর্তমানের মতো ‘পাকিস্তান’ নয়, বরং ‘পাকস্তান’ ছিল।

চৌধুরী রহমত আলী যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন। তিনি ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি মুসলিম-প্রধান অঞ্চলের নামের অংশ মিলিয়ে নতুন রাষ্ট্রের নাম তৈরি করেন। অঞ্চলগুলো ছিল পাঞ্জাব, আফগানিয়া বা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, কাশ্মীর, সিন্ধ এবং বেলুচিস্তান। এসব নামের অংশ একত্র করে তৈরি হয় ‘পাকস্তান’। পরে উচ্চারণ সহজ করার জন্য এর মধ্যে একটি ‘ই’ অক্ষর যুক্ত হয় এবং নামটি পরিচিত হয় ‘পাকিস্তান’ নামে।

এই নাম দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যদিও তখনও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়নি, তবুও মুসলিম রাজনীতির আলোচনায় সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রের পরিচয় হিসেবে ‘পাকিস্তান’ নামটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

তবে রহমত আলীর কল্পনা শুধু একটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি পরবর্তীতে দাবি করেন, তিনি আরও বৃহৎ একটি মুসলিম রাষ্ট্রের ধারণা করেছিলেন, যেখানে ইরান, আফগানিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার কিছু অঞ্চলও যুক্ত হতে পারে।

জীবনের বেশিরভাগ সময় ইংল্যান্ডে কাটালেও ১৯৪৮ সালে রহমত আলী পাকিস্তানে যান। তার আশা ছিল, যে রাষ্ট্রের নাম তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, সেখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তার রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতির বড় পার্থক্য রয়েছে।

রহমত আলী স্পষ্ট করে দেন যে, তিনি প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বড় একটি মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এমনকি তিনি নতুন একটি রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও বলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার তাঁর প্রতি বিরূপ মনোভাব গ্রহণ করে। তাকে পাকিস্তানি পাসপোর্ট দেওয়া হয়নি। পরে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যান এবং ১৯৫১ সালে কেমব্রিজে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার দেওয়া নামটিই আজও পাকিস্তানের পরিচয় হয়ে আছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বেলুচ জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। যদিও বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের অংশ হিসেবেই স্বীকৃত।

এই প্রেক্ষাপটে অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে- যেহেতু পাকিস্তান নামের শেষ অংশের সঙ্গে বেলুচিস্তানের সম্পর্ক রয়েছে, তাই বেলুচিস্তান আলাদা হয়ে গেলে পাকিস্তানের নাম কী হবে?

অনেকে রসিকতা করে বলেন, বেলুচিস্তান চলে গেলে পাকিস্তানের নাম থেকে ‘স্তান’ অংশ বাদ যাবে কি না।

তবে বাস্তবতা এ-ও যে, কোনো দেশের নাম শুধু শব্দের অর্থ বা উৎপত্তির ওপর নির্ভর করে না। রাষ্ট্রের নাম নির্ধারিত হয় সংবিধান, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে। তাই কোনো একটি অঞ্চল আলাদা হয়ে গেলেই একটি দেশের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয় না।

চৌধুরী রহমত আলীর ১৯৩৩ সালের প্রস্তাব এবং পরবর্তী সময়ে তার বৃহত্তর পরিকল্পনার মধ্যেও পার্থক্য ছিল। ১৯৩৩ সালের প্রস্তাবে তিনি শুধু ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি মুসলিম-প্রধান অঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক রাষ্ট্রের ধারণা দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯৪০-এর দশকে তিনি আরও বড় একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। এই পরিকল্পনায় তিনি সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে একটি নতুন নামে অভিহিত করার ধারণা দেন এবং মুসলিম অধ্যুষিত বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য একাধিক পৃথক রাষ্ট্রের প্রস্তাব করেন।

এই পরিকল্পনায় তিনি পাকিস্তানের পাশাপাশি বাংলা ও আসাম নিয়ে একটি পৃথক রাষ্ট্র, হায়দরাবাদের নিজাম শাসিত অঞ্চল নিয়ে আরেকটি রাষ্ট্র এবং আরও কয়েকটি ছোট রাষ্ট্রের ধারণা দেন। তবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, কংগ্রেসসহ প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাঁর এসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। অধিকাংশ রাজনীতিবিদ এগুলোকে বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কল্পনা হিসেবে দেখেছিলেন।

চৌধুরী রহমত আলীর চিন্তার সঙ্গে তৎকালীন অন্য মুসলিম নেতাদেরও পার্থক্য ছিল। ১৯৩০ সালের এক অধিবেশনে কবি ও দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবাল উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিমদের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ধারণা দিয়েছিলেন। তবে রহমত আলী মনে করতেন, এই ধারণা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবির তুলনায় সীমিত।

অন্যদিকে, মাওলানা আবুল আ'লা মওদুদি ও তার প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী প্রথমদিকে ভৌগোলিক ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের ধারণার বিরোধিতা করেছিল। তাদের মত ছিল, ইসলামকে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। তবে দেশভাগের পর তাদের রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন আসে এবং তারা পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। এ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে।