যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সাড়ে তিন মাসের মাথায় ইরানের সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও বৈরিতা অবসানের লক্ষ্যে শান্তিচুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চুক্তিটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেকেই এটিকে ওয়াশিংটনের কৌশলগত বিজয় নয়, বরং ইরানের কাছে কার্যত ‘আত্মসমর্পণের দলিল’ হিসেবে দেখছেন।
সোমবার (১৫ জুন) ঘোষিত এই শান্তিচুক্তি নিয়ে এমএস নাউকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কংগ্রেসম্যান সেথ মোল্টন বলেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ চুক্তি। এটি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কাছে আত্মসমর্পণের দলিল।’
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক হামলা চালায়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন বলে দাবি করা হয়। হামলার পর ট্রাম্প ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং ধারণা করেছিলেন, দেশটির শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়বে।
কিন্তু নতুন শান্তিচুক্তির শর্তগুলো প্রকাশের পর পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ছাড় করবে, আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথে এগোবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতিও কমাতে পারে। এছাড়া যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে ইরানকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
এর বিপরীতে ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। পাশাপাশি যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালিও পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।
সমালোচকদের মতে, এই প্রতিশ্রুতিকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সাফল্য হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। কারণ ইরান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য সামরিক নয়, বরং শান্তিপূর্ণ ব্যবহার। ফলে পুরোনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করাকে নতুন অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো নয়, বরং দেশটির সরকারব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নির্মূল করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য পূরণ না হয়ে উল্টো কূটনৈতিক সমঝোতার পথেই ফিরতে হয়েছে ওয়াশিংটনকে।
চুক্তির আগে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্কেও টানাপোড়েনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইরানের সঙ্গে আলোচনার সময় লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প একাধিকবার অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এমনকি নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ ও ‘বিচার-বিবেচনাহীন ব্যক্তি’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন বলে জানা যায়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কেই নয়, আরব মিত্রদের সঙ্গেও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধের কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়ও চাপে পড়েছে।
সব মিলিয়ে সমালোচকদের দাবি, এই শান্তিচুক্তি ইরানের ওপর কৌশলগত বিজয়ের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধ থেকে সম্মানজনক প্রস্থানের পথ তৈরি করেছে। আর সে কারণেই মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি অংশ একে ‘আত্মসমর্পণের দলিল’ হিসেবে অভিহিত করছে।


