× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৬:০৪ এএম

মার্শাল আর্টের আড়ালে উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৬:০৪ এএম

মার্শাল আর্টের আড়ালে  উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক

বাংলাদেশে উগ্রবাদী তৎপরতার ধরনে এসেছে নতুন ও কৌশলী পরিবর্তন। সাধারণ চোখে যা কেবল শারীরিক কসরত বা মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ। তার আড়ালেই চলছে তরুণদের মগজ ধোলাই। চলছে তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর আদলে ‘তেহরিকে তালেবান বাংলাদেশ’ (টিটিবি) গঠনের এক সুগভীর ষড়যন্ত্র। ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম (এফসিএস)’ নামের একটি কথিত আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ সংগঠনের আড়ালে দেশজুড়ে বিস্তৃত করা হচ্ছে এই জঙ্গি নেটওয়ার্ক। এমন তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকায় প্রশিক্ষণকালে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের রিমান্ডে নিয়ে চলছে জিজ্ঞাসাবাদ। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দেওয়া চাঞ্চল্যকর সব তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। তৈরি হচ্ছে এই চক্রের জড়িত অন্যদের তালিকা। তাদের আইনের আওতায় আনতে শুরু হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। 

যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু রূপালী বাংলাদেশকে জানান, উগ্রবাদী সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে যাত্রাবাড়ী থানাধীন ডেমরা কোনাপাড়ার মিনি কক্সবাজার এলাকার আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের পাশের বালুর মাঠে সমবেত হয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল এফসিএসের সদস্যরা। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রোববার ভোর আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে সেখানে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে এই চক্রের মূল হোতা ও প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবিরসহ (২৩) ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হলেনÑ মো. হোসাইন তানিম (২০), মো. জুনায়েদ (২২), আতাউল্লাহ শাহ (৩২), মো. আবিদুর রহমান (২০) ও মো. বায়োজিত (৩০)। তাদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ৭ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত প্রত্যেকের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তারা সিটিটিসির (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) হেফাজতে রয়েছেন।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী রূপালী বাংলাদেশকে জানান, গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেলে পরবর্তীতে জানানো হবে।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, গ্রেপ্তারদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক ইউনিটের সমন্বয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের সঙ্গে উগ্রবাদী কোন কোন সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছেÑ তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো কর্মকর্তা মুখ খুলছেন না।

এদিকে উগ্রবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের সাথে সংশ্লিষ্টরা। সংগঠনটির যশোরের সিদ্ধিপাশা শাখার দায়িত্বশীল আব্দুল্লাহ আল মামুন ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, শনিবার ভোরে রমনা পার্কে শাহ আমানত সাবির পূর্বনির্ধারিত প্রশিক্ষণ দিতে গেলে পুলিশি বাধার মুখে পড়েন। আইনি ও আনুষ্ঠানিক বিধিনিষেধের কারণে সেখান থেকে সরে এসে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীদের বায়তুল মোকাররমের সামনে আসার আহ্বান জানান। পরে সেখানে আগত প্রায় ১৮ জন সহযোগীকে নিয়ে মাশওয়ারা (পরামর্শ) করে তারা যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া বালুর মাঠে গিয়ে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। মামুন দাবি করেন, রোববার ভোরে পুলিশ প্রথমে মাঠ থেকে দুই প্রশিক্ষণার্থীকে ধরে নিয়ে যায়। এই খবর পেয়ে খুলনা থেকে আসা প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবির ও হোসাইন তানিম যাত্রাবাড়ী থানায় খোঁজ নিতে গেলে পুলিশ তাদেরও গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে, শাহ আমানত সাবিরের আটকের পর ফাতাহ কমব্যাটের ফেসবুক পেজ থেকে তার মুক্তির দাবি জানিয়ে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। তবে রহস্যের সৃষ্টি হয় যখন ওই পোস্টের মন্তব্য ঘরে (কমেন্ট বক্স) একই পেজ থেকে লেখা হয়Ñ ‘সকল আল-কায়েদা আইএস পন্থি ভাইয়েরা থানায় চলে আসেন।’ এই বিষয়ে জানতে চাইলে পেজ অ্যাডমিন আব্দুল্লাহ আল মামুন দাবি করেন, মন্তব্যটি তাদের কোনো অ্যাডমিন করেননি। প্যানেলের কেউ এর সঙ্গে জড়িত নন। কিছু সময় পর মন্তব্যটি মুছে ফেলা হয় বলেও তিনি জানান। তবে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র।

সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গতকাল সোমবার থেকে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যৌথভাবে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এই নেটওয়ার্কের গভীরতা এবং অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে খুলনা থেকে শুরু হয় এফসিএসের কার্যক্রম। এরপর যশোর, অভয়নগর, সিদ্ধিপাশা, চাঁদপুরেও একে একে শাখা রয়েছে। ঢাকায় একটি নতুন শাখা খোলা হয়েছিল। ঢাকায় প্রথম সেশনের প্রশিক্ষণ শুরু করতে গিয়েই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরাশায়ী হন মাস্টারমাইন্ড শাহ আমানত সাবিরসহ আরও ৫ জন। সূত্রমতে, শাহ আমানত সাবির ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ন্যাশনাল স্কুল অব ব্যুত্থান মার্শাল আর্টের খুলনা শাখা পরিচালনা করেন। ২০২৫ সালের শেষের দিকে তিনি টিটিবির সঙ্গে জড়ান। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠা করেন ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম নামে একটি মার্শাল আর্ট স্টাইল। আমানত সাবির দাবি করেন, এটি বিশে^র প্রথম শিরক, কুফর ও মিউজিকমুক্ত মার্শাল আর্ট স্টাইল।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, শাহ আমানত সাবির ও তার সংগঠন আফগান ফেরত উগ্রপন্থিদের সহায়তায় বাংলাদেশে টিটিবি গঠনের চেষ্টা করছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কিছুদিন ধরেই ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের সন্দেহভাজন কার্যক্রম নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। শনিবার ভোরের দিকে সাবির ও তার দল রমনা পার্কে প্রশিক্ষণের চেষ্টা করলে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। এরপর তারা চতুরতার সঙ্গে স্থান পরিবর্তন করে বায়তুল মোকাররম হয়ে যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া বালুর মাঠে গিয়ে ১৮-২০ জন মিলে গোপন প্রশিক্ষণ শুরু করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রোববার ভোরে যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এ বি সিদ্দিকের নেতৃত্বে একটি দল আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের পাশের বালুর মাঠে অভিযান চালায়। সেখান থেকে পালানোর চেষ্টাকালে এই ছয়জনকে আটক করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম বর্তমানে খুলনা, যশোর, চাঁদপুর এবং সুতারখালী ও অভয়নগরের মতো উপজেলা পর্যায়ে শাখা বিস্তার করেছে। স্থানীয় স্টেডিয়ামে ‘সেলফ ডিফেন্স’ শেখানোর নামে জনসম্মুখে কার্যক্রম চালালেও ভেতরের ছকটি ভিন্ন। প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে শুরুতে কোনো উগ্রবাদী আলোচনা করা হয় না। পরে তাদের নিয়ে ‘টেলিগ্রাম’ গ্রুপ খুলে আল-কায়েদা ও টিটিপির উগ্র মতাদর্শের ভিডিও এবং বয়ান শেয়ার করা হয়। যারা এতে ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাদের আলাদা করা হয়। গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে, রাজধানীর একটি এলাকায় চলে এই নেটওয়ার্কের মূল প্রশাসনিক কাজ ও প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ (রিক্রুটমেন্ট)। বিভিন্ন শাখায় প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে বাছাইকৃত তরুণদের নিয়ে যাওয়া হতো কিশোরগঞ্জের নিকলীর ছাতির চরের মতো দুর্গম প্রত্যন্ত এলাকায়। সেখানে চলত শারীরিক কসরতের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র চালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। তবে তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে এখনো সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছে না সংশ্লিষ্ট সূত্র।

গোয়েন্দা সূত্রমতে, এই টিটিবি (তেহরিকে তালেবান বাংলাদেশ) সংগঠনের আমির হিসেবে মুফতি উসমান (মুফতি আবু ইমরান) এবং প্রচারে তামিম আল আদনানি নামের এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। এ ছাড়া ইমরান হায়দার নামের এক ব্যক্তি বাংলাদেশ-সংক্রান্ত কার্যক্রমের সমন্বয়ক হিসেবে ফেসবুক ও টেলিগ্রামে অর্থ সংগ্রহ ও সদস্য সংগ্রহের কাজ করছে। আর শাহ আমানত সাবির টিটিবির গ্যারিলা শাখার অন্যতম সমন্বয়ক।

শাহ আমানত সাবিরের এই গেরিলা মিশনের অন্যতম সহযোগী মো. মাহফুজুর রহমান। তিনি ‘বাংলাস্তানের জঙ্গি’ নামক ফেসবুক পেজ পরিচালনা করেন। এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না দাবি করে, ফাতাহর যশোর শাখার দায়িত্বশীল ফয়সাল দাবি করেছেন, তারা শুধু মার্শাল আর্ট শেখেন। তাদের সঙ্গে উগ্রবাদের কোনো যোগসূত্র নেই।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মার্শাল আর্ট সেন্টারের আড়ালে কিশোর-তরুণদের মগজ ধোলাইয়ের এই নতুন কৌশল প্রচলিত জঙ্গি সংগঠনের চেয়েও বিপজ্জনক। এখনই এই নেটওয়ার্কের শিকড় উপড়ে ফেলা না গেলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!