বর্তমানে দেশে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী শ^াসতন্ত্রের রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মতো অসংক্রামক রোগসমূহ মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশেরও বেশির জন্য দায়ী। এর মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ মৃত্যুই অকালপ্রাপ্ত, যা দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও জাতীয় টেকসই উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ‘হোল-অব-গভর্নমেন্ট’ বা সর্বাত্মক সরকারি উদ্যোগ জোরদার করা হচ্ছে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে এ বিষয়ে গঠিত সমন্বয় কমিটির প্রথম উচ্চপর্যায়ের সভা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সভায় ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করে। সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ।
সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণকে সরকারের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি গতানুগতিক চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে নতুন ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘সুস্থ থাকার জন্য জনসাধারণকে হাঁটাচলা ও কায়িক পরিশ্রম করতে হবে। কোনো কোনো দেশে জনসাধারণকে প্রতিদিন অন্তত ৩ কিলোমিটার হাঁটাচলা করতে দেখেছি। আমরা যদি মানুষকে বুঝাতে পারি ওষুধ বা চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে জোর দেওয়া দরকার, তাহলে অসংক্রামক রোগ অনেক কমে আসবে।’
অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ মোকাবিলায় গত বছরের ২০ আগস্ট সরকারের ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের যৌথ অংশগ্রহণে একটি ঐতিহাসিক যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে এই সমন্বয় কমিটি গঠন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। গতকালের সভায় আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। আগামী ১ মাসের মধ্যে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যৌথ ঘোষণা বাস্তবায়ন, সমন্বয় এবং অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রদানের জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা (ফোকাল পয়েন্ট) মনোনয়ন দেবে।
মনোনীত ফোকাল পয়েন্টদের জন্য অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত এবং যৌথ ঘোষণা বাস্তবায়ন সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন দেওয়া হবে। আগামী ১ থেকে ৩ মাসের মধ্যে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নিজ নিজ খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে, যার মধ্যে মনিটরিং কাঠামো ও পরিমাপযোগ্য সূচক অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সভায় ‘সব নীতিতে স্বাস্থ্য’ নীতিগত দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। এ ছাড়া দেশব্যাপী সর্বাত্মক সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, সম্পদ ও কারিগরি সহায়তার সংস্থান, নিয়মিত অগ্রগতি তদারকি এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিবন্ধকতা নিরসনে কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সব কারিগরি সহায়তা প্রদানে তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। এ ছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা এই যৌথ ঘোষণা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন