ক্যাম্পাসে রাজনীতি, প্রয়োজন নাকি প্রতিবন্ধকতা? এই প্রশ্ন ছুড়ে দিলে অধিকাংশ মানুষের ভোট সম্ভবত প্রতিবন্ধকতার পক্ষেই পড়বে। কারণ, ক্যাম্পাসে রাজনীতির নামে দলীয় লেজুড়বৃত্তির যে কদর্য চেহারা বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে, তাতে খুব কম অভিভাবকই এখন চান তাদের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত হোক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে নেতৃত্ব গড়ে উঠবে কীভাবে?
শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রীয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে কীভাবে? আর ক্যাম্পাসে রাজনীতি বন্ধ হলেই কি সাধারণ শিক্ষার্থীর ওপর নির্যাতন বন্ধ হবে, নাকি শিক্ষার মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত হবে? বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজের অবদান অনস্বীকার্য।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানÑ সব ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নিঃসন্দেহে এগুলো ছাত্রসমাজের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ছাত্র আন্দোলন এবং দলীয় ছাত্র-রাজনীতি কি একই বিষয়?
দেশ, জাতি কিংবা গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীরা যে সংগ্রাম করেছেন, তা ছিল ছাত্র আন্দোলন। কিন্তু যখন সেই আন্দোলন দলীয় ছাত্র-রাজনীতিতে রূপ নেয়, তখন এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক দলের আনুগত্য, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা। ফলে ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রায়ই মূল রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, তাদের ছাত্রসংগঠন অনেক সময় ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছে। এরশাদ আমলে ছাত্রসমাজ, বিএনপির আমলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির এবং আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগÑ প্রতিটি সময়েই ক্যাম্পাসে সংঘাত, দখলদারিত্ব ও ক্ষমতার রাজনীতির অভিযোগ উঠেছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে ছাত্র-রাজনীতি নিয়ে এক ধরনের ভীতি ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে।
তবে এটাও সত্য যে, রাজনীতি ছাড়া নেতৃত্বের বিকাশ সম্ভব নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করার অন্যতম ক্ষেত্র হলো বিশ্ববিদ্যালয়। তাই ছাত্র-রাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে এর কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
নিয়মিত ও কার্যকর ছাত্রসংসদ নির্বাচন এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে। যদি দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে প্রকৃত শিক্ষার্থীরা নেতৃত্বের সুযোগ পাবেন। তারা শিক্ষার্থীদের সমস্যা, দাবি ও অধিকার নিয়ে কাজ করতে পারবেন। এতে নেতৃত্বের বিকাশও ঘটবে, আবার দলীয় সংঘাতও কমবে। এ ছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো অন্যায়, বৈষম্য বা প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে এসব সংগঠনও শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম। ফলে দলীয় রাজনীতি না থাকলেও প্রতিবাদের ভাষা ও গণতান্ত্রিক চর্চা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবেÑ এমন ধারণা সঠিক নয়।
অন্যদিকে, অনেকেই যুক্তি দেন যে জাতীয় রাজনীতির চেহারাও যদি দুর্বল ও সমস্যাসঙ্কুল হয়, তাহলে কি রাজনীতিই বন্ধ করে দেওয়া উচিত? একইভাবে গণমাধ্যমে ভুল তথ্য বা গুজবের বিস্তার থাকলেও কি গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া সমাধান? নিশ্চয়ই নয়। সমস্যার সমাধান হলো সংস্কার, নিষেধাজ্ঞা নয়।
তাই ক্যাম্পাসে রাজনীতি বন্ধ করার অর্থ শিক্ষার্থীদের রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা নয়। বরং দলীয় প্রভাবমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও শিক্ষার্থীকল্যাণমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হওয়া উচিত লক্ষ্য। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সচেতনতা থাকবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুযোগ থাকবে; কিন্তু তা যেন কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থ বাস্তবায়নের হাতিয়ার না হয়। বর্তমানে দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠানে তা কার্যকরও করা হয়েছে। রাজনীতি করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকেরই রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদেরও। তবে সেই রাজনীতি হতে হবে মূল্যবোধভিত্তিক, গণতান্ত্রিক এবং শিক্ষার্থীস্বার্থকেন্দ্রিক। যদি রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষার্থীদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা বন্ধ না করে, যদি ক্যাম্পাসে মেধাবীদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না হয়, তাহলে দলীয় ছাত্র-রাজনীতি বন্ধের দাবি আরও জোরালো হবে।
পরিশেষে বলা যায়, ক্যাম্পাস রাজনীতি নিজে কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়; প্রতিবন্ধকতা হলো দলীয় লেজুড়বৃত্তিনির্ভর, সহিংস ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি। তাই প্রয়োজন রাজনীতি নিষিদ্ধ করা নয়, বরং এর সংস্কার। এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে, নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ করতে পারবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার স্থান নয়, এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরিরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন