উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শক্তি তার ভবন, অবকাঠামো কিংবা প্রশাসনিক কাঠামোয় নয়, তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে বিশ্বাস, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং একাডেমিক সততায়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সমাজ যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আস্থা রাখে, তখনই সেটি প্রকৃত অর্থে জ্ঞানচর্চা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে একের পর এক নিয়োগ-বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ সামনে আসে, তখন উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) দেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জাতীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৌশলী, গবেষক ও বিশেষজ্ঞ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে বুটেক্সকে ঘিরে ওঠা সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোকে কোনোভাবেই একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মান, সুশাসন এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন।
বুধবার রূপালী বাাংলাদেশে ‘অপকর্মের নাটের গুরু বুটেক্স ভিসি জুলহাস’ শিরোনামের প্রতিবেদনে যে অপকর্মের তথ্য উঠে এসেছে তা রীতিমতো উদ্বেগের। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, আর্থিক জবাবদিহির অভাব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানসংক্রান্ত প্রশ্ন এবং অতীতের কিছু বিতর্কিত ঘটনার পুনরুত্থান। অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু অভিযোগের সংখ্যা, ব্যাপ্তি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিবেচনায় বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা নয়; বরং একটি নৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সব সিদ্ধান্ত হবে স্বচ্ছ, নিয়মভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটি কেবল একটি পদে নিয়োগের বিষয় থাকে না; বরং পুরো প্রতিষ্ঠানের মেধাভিত্তিক কাঠামো নিয়েই সন্দেহ সৃষ্টি করে। একজন যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠীর পছন্দের ব্যক্তিকে সুযোগ দেওয়া হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো প্রশাসনে পড়ে। ফলে নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
একইভাবে উন্নয়ন প্রকল্প ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত অভিযোগগুলোও গুরুত্বের দাবি রাখে। সরকারি অর্থ জনগণের অর্থ। সেই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কোনো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরও বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা, প্রকল্প-পরবর্তী প্রতিবেদন জমা না দেওয়া কিংবা উদ্বৃত্ত অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। যদি এসব অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি থাকে, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; বরং সুশাসনের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আমরা মনে করি, এ মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন অন্যায়, তেমনি অভিযোগগুলোকে উপেক্ষা করাও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। একই সঙ্গে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগও সংশ্লিষ্টদের দিতে হবে। কারণ ন্যায়বিচারের অন্যতম শর্ত হলো, অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত উভয়ের বক্তব্য সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।
বুটেক্স কোনো ব্যক্তির নয়, এটি একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। দেশের টেক্সটাইল শিল্পের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির দায়িত্ব যার কাঁধে, সেই প্রতিষ্ঠানে আস্থার সংকট তৈরি হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো খাত। তাই বুটেক্সকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং দ্রুত তদন্ত এখন সময়ের দাবি। কারণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শুধু অনিয়ম প্রতিরোধই করে না, বরং প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থাও পুনর্গঠন করে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন