(গতকালের পর)
অগ্রিম মূল্য পরিশোধের শর্ত : ১,০০০ ডলার পর্যন্ত ইএক্সপি-বিহীন চালানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার স্বার্থে পণ্যের শতভাগ মূল্য অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেল কিংবা বৈধ ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে অগ্রিম গ্রহণ করতে হবে।
শিপিং ও রেমিট্যান্স সহজীকরণ : শিপিং ডকুমেন্টগুলো সরাসরি বিদেশি খুচরা ক্রেতার নামে ইস্যু করা যাবে। বৈশ্বিক মার্কেটপ্লেসে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বার্ষিক সাবস্ক্রিপশন বা মেম্বারশিপ ফি পরিশোধের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমোদিত ডিলার শাখাগুলোর মাধ্যমে বছরে ৫,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
পেমেন্ট রিসিভ মেকানিজম : টাকা আসার প্রকৃত পদ্ধতি। আমাজন বা ই-বে থেকে অর্জিত অর্থ উদ্যোক্তারা ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, ওটিসি (ঙাবৎ-ঃযব-ঈড়ঁহঃবৎ) পেমেন্ট গেটওয়ে বা অনুমোদিত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সার্ভিস প্রোভাইডারদের (যেমন পেওনিয়ার, পিংপং বা ওয়াইজ) মাধ্যমে সরাসরি দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের ডমেস্টিক অ্যাকাউন্টে নিয়ে আসতে পারবেন।
প্রথম ধাপে কোন পণ্যগুলো বেছে নেবেন উদ্যোক্তারা?
১. হস্তশিল্প ও হোম ডেকর : বৈশ্বিক হস্তশিল্পের বাজার ২০২৬ সালে ৯০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশের নকশিকাঁথা, মাটির জিনিসপত্র, বাঁশ ও বেতের পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা এবং লাভের সুযোগ সবচেয়ে বেশি (প্রায় ২০০% থেকে ৩০০%)।
২. পাটজাত ও পরিবেশবান্ধব পণ্য :আমাজন ও ইটসি-তে জুট শপিং ব্যাগ ও ম্যাটের বাজার প্রতি বছর ১৮.৫% হারে বাড়ছে। বৈশ্বিক ই-কমার্সে পরিবেশবান্ধব পণ্যের অনুসন্ধান গত দুই বছরে প্রায় ৪৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
৩. চামড়াজাত ও ফুটওয়্যার : প্রিমিয়াম লেদার ওয়ালেট, বেল্ট ও জুতার বিশ্ববাজার প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র বুটিক হাউসগুলো সরাসরি ই২ঈ মডেলে এই বাজারে প্রবেশ করতে পারে, যেখানে গড় লাভের হার ১২০%-এর ওপরে।
৪. ডিজাইনার ও নিটওয়্যার পোশাক : কাস্টমাইজড টি-শার্ট, ঐতিহ্যবাহী জামদানি মোটিফের স্কার্ফ বা এথনিক ফিউশন পোশাকের জন্য আন্তর্জাতিক রিটেইল ক্রেতারা চড়া মূল্য দিতে প্রস্তুত।
ডিরেক্ট বা ড্রপ-শিপিং মডেল (ঋইগ) :
এই মডেলে পণ্য উদ্যোক্তার নিজের দেশে মজুত থাকে। অর্ডার পাওয়ার পর উদ্যোক্তা বাংলাদেশ থেকে ডিএইচএল, ফেডেক্স বা ডাক বিভাগের মাধ্যমে সরাসরি ক্রেতার বিদেশি ঠিকানায় পার্সেল পাঠিয়ে দেন। এটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী, কারণ এতে বিদেশের গুদাম ভাড়া দিতে হয় না।
মার্কেটপ্লেস ওয়্যারহাউজ মডেল (ঋইঅ): এই মডেলে উদ্যোক্তারা একসঙ্গে বড় লটে পণ্য আমাজন বা সংশ্লিষ্ট মার্কেটপ্লেসের বিদেশের সেন্ট্রাল ওয়্যারহাউজে আগে থেকেই পাঠিয়ে জমা রাখেন। বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা মতে, এই মডেল ব্যবহার করলে ডেলিভারির সময় প্রায় ৭০% কমে আসে, যা ক্রেতার সন্তুষ্টি এবং সেলার রেটিং ৪০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম ও ডাক বিভাগ ডাক বিভাগের ইএমএস (ঊীঢ়ৎবংং গধরষ ঝবৎারপব) ব্যবস্থাকে কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (অংুপঁফধ ডড়ৎষফ) সফটওয়্যারের সঙ্গে সমন্বিত করা হচ্ছে, যাতে কুরিয়ার খরচ এক-তৃত্যাংশে নেমে আসে।
পলিসি অ্যাডভোকেসি : ডিসিআরএএফ (উঈজঅঋ)-এর পর্যবেক্ষণ ও ভূমিকা।
বাংলাদেশের ডিজিটাল কমার্স খাতের সামগ্রিক আইনি কাঠামো সংস্কার এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম’ (ডিসিআরএএফ)। ডিসিআরএএফ-এর সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক গবেষণা ও নীতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, ক্রস-বর্ডার বাণিজ্যে প্রজ্ঞাপন জারি হওয়া বড় অর্জন হলেও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাজের সমন্বয়হীনতা মাঠপর্যায়ের উদ্যোক্তাদের বড় ক্ষতি করতে পারে।
নকল ও ভেজাল পণ্যে নিষেধাজ্ঞা: নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, কোনো নকল, ভেজাল বা অবাস্তব পণ্য কেনাবেচা করা যাবে না। ‘ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’-এর ধারা ৪৫ ও ৫৩ এবং অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে ‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২’ ও ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩’-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী কড়া নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
একক আইডি’র বিকল্প প্রস্তাব : পূর্বে ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি (উইওউ) বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হলেও, বাস্তবে আরজেএসসি (জঔঝঈ) সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে উইওউ পাওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও জটিল। এর বিকল্প হিসেবে উদ্যোক্তার জাতীয় পরিচয়পত্র (ঘওউ), ট্রেড লাইসেন্স কিংবা টিআইএন (ঞওঘ)-এর যেকোনো একটিকে ‘একক আইডি’ হিসেবে বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা শুরুর সহজ সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংক বনাম কাস্টমস প্রোটোকল কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১,০০০ ডলার পর্যন্ত চালানে ঊঢচ ফরম শিথিল করলেও, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরে বা বন্দরে প্রচলিত রপ্তানি ফাইলের জটিলতা দেখায়।
কাস্টমসের সিস্টেমে (অংুপঁফধ ডড়ৎষফ) ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের জন্য আলাদা ‘গ্রিন চ্যানেল’ এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
এনবিআর-এর ভ্যাট/ট্যাক্স জটিলতা :
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যখন ছোট পার্সেল বিদেশে পাঠাবেন, তখন ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২’-এর রপ্তানি সংক্রান্ত ধারা ৩ (শূন্য হারের ভ্যাট) এবং ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়াটি প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত জটিল। লজিস্টিকস খরচ : বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার চার্জ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুবিধার্থে বিমান ভাড়া এবং লজিস্টিকস চার্জ কমাতে বিশেষ সরকারি ভর্তুকি প্যাকেজ দিতে হবে।
নতুন স্ট্র্যাটেজিক প্রস্তাবনা ও আইনি সাজেশন
সেন্ট্রাল ই-কমার্স কনসোলিডেশন হাব’ : ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সংলগ্ন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (চচচ) একটি হাব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এই হাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্ষুদ্র সিঙ্গেল পার্সেলগুলো একত্রিত করে বড় বাণিজ্যিক লটে কম খরচে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে কার্গো করা হবে। এতে শিপিং খরচ প্রায় ৪০% পর্যন্ত কমে আসবে।
‘রি-ইমপোর্টেশন’ বিধির সহজীকরণ : আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী বৈস্মিক ই-কমার্স-এ গড় রিটার্ন রেট বা পণ্য ফেরতের হার প্রায় ১৫% থেকে ২০%। কিন্তু বর্তমানে *‘কাস্টমস অ্যাক্ট, ২০২৩’-এর ধারা ৪৭ অনুযায়ী, পণ্য ফেরত আসলে সেটিকে নতুন ‘আমদানি’ হিসেবে গণ্য করে চড়া শুল্ক আরোপ করা হয়। ই-কমার্স রপ্তানিকে টেকসই করতে হলে বিশেষ এসআরও (ঝজঙ)-এর মাধ্যমে ই-কমার্স রিটার্ন পার্সেলকে শুল্কমুক্ত (উঁঃু-ঋৎবব জব-রসঢ়ড়ৎঃধঃরড়হ) সুবিধা দিতে হবে।
স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও সরকারি ফান্ডিং : সরকারি অর্থায়নে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আমাজন/ই-বে লিস্টিং ও এসইও (ঝঊঙ)-এর ওপর দেশব্যাপী ফ্রি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। প্রচলিত তৈরি পোশাক খাতের মতো এই ই-কমার্স রপ্তানির ক্ষেত্রেও নধহশরহম চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসার পর অতিরিক্ত ৪% থেকে ৫% বিশেষ ক্যাশ ইনসেনটিভ দেওয়া উচিত।
ডিসিআরএএফ (উঈজঅঋ)-এর পক্ষ থেকে শেষ স্ট্র্যাটেজিক সাজেশন।
‘জাতীয় ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স সেল’ গঠন : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, কাস্টমস, ডাক বিভাগ এবং বেসরকারি খাতের (ডিসিআরএএফ ও ই-ক্যাব) প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘ওয়ান-স্টপ টাস্কফোর্স’ বা বিশেষ সেল গঠন করা প্রয়োজন, যা সরাসরি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো মাঠপর্যায়ের জটিলতা সমাধান করবে।
ক্ষুদ্র রপ্তানি ঋণ (গরপৎড়-ঊীঢ়ড়ৎঃ ঈৎবফরঃ) : বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যেখানে আপডেট করা ট্রেড লাইসেন্স বা টিআইএন (ঞওঘ)-এর বিপরীতে প্রথম চালানের পণ্য তৈরি ও শিপিংয়ের জন্য জামানতবিহীন এবং সর্বোচ্চ ৪% থেকে ৫% সুদে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘ক্ষুদ্র রপ্তানি ঋণ’ দেওয়া হবে।
ডিজিটাল এক্সপোর্ট ইনকিউবেশন সেন্টার প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিসিক (ইঝঈওঈ) এবং ডিসিআরএএফ (উঈজঅঋ)-এর যৌথ কারিগরি সহায়তায় ইনকিউবেশন সেন্টার করা উচিত, যেখানে হাই-স্পিড ইন্টারনেট, আন্তর্জাতিক মানের ক্যাটালগিং ও প্রডাক্ট ফটোগ্রাফি স্টুডিওর সুবিধা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারবেন। আন্তর্জাতিক ই-কমার্সে নামার আগে উদ্যোক্তাদের জন্য গাইডলাইন।
আইনি প্রস্তুতি : আপনার ঘওউ, আপডেট করা ট্রেড লাইসেন্স এবং ঞওঘ সার্টিফিকেট প্রস্তুত রাখুন।
মার্কেটপ্লেস অ্যাকাউন্ট : আমাজন, ই-বে বা ইটসি-এর মতো প্ল্যাটর্মে স্টোর খোলার জন্য ব্যাংকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কার্ডের ইআরকিউ (ঊজছ) অ্যাকাউন্ট এবং সাবক্রিঁপশন ফির ব্যাকআপ নিশ্চিত করুন।
কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স : পণ্যের আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড, প্যাকেজিং এবং ছবি যেন শতভাগ আসল ও বিশ্বমানের হয় তা নিশ্চিত করুন; কারণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নেতিবাচক রিভিউ আপনার স্টোরটি চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারে।
নীতিমাালার চেয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নই আসল সাহস
একজন সম্ভাবনাময় দেশীয় উদ্যোক্তা যেন শুধু আইনি জটিলতার ভয়ে বা অজানা আশঙ্কায় পিছিয়ে না পড়েন, বরং সাহস করে বিশ্ববাজারে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারেনÑ তার জন্য কেবল কাগজ-কলমে চমৎকার নীতিমালাই যথেষ্ট নয়। নীতিমাালার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো এর শতভাগ মাঠপর্যায়ের ও হয়রানিমুক্ত বাস্তবায়ন। যে বাংলাদেশ একসময় শুধু শ্রমশক্তি রপ্তানি করত, সেই বাংলাদেশ এখন নিজের ব্র্যান্ড, নিজের পণ্য এবং নিজের উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে যাচ্ছে। সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ব্যবসাবান্ধব নীতিগত রূপান্তর দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ডলার সংকট মোকাবিলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সর্বোপরি গলোবাল মার্কেটে ‘গধফব রহ ইধহমষধফবংয’ ব্র্যান্ডকে এক নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করবে।
এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সব সরকারি বিভাগের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ঝেড়ে ফেলে একটি সমন্বিত, মসৃণ, হয়রানিমুক্ত ও দ্রুত কার্যকরী লজিস্টিকস রোডম্যাপ মাঠপর্যায়ে ফুটিয়ে তোলা। তবেই কাগজের নীতিমালা উদ্যোক্তাদের জন্য বিশ্বজয়ের বাস্তব হাতিয়ার হয়ে উঠবে।
প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন