শিক্ষক সংকট, নিরাপত্তাহীনতা, আবাসন ও খাবার ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনাসহ নানা সমস্যায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গাজীপুরের মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস)-এর শিক্ষার্থীরা। সরকারি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
গাজীপুর মহানগরীর পূবাইল এলাকায় ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস)। চার বছর মেয়াদি এই কোর্সের মাধ্যমে চিকিৎসা সহকারী তৈরির লক্ষ্যে এখানে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতি বর্ষে ৩২ জন করে মোট ৯৬ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ থাকলেও গত তিন বছরে ভর্তি হয়েছে মাত্র ৭২ জন শিক্ষার্থী। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও হোস্টেলের পরিচ্ছন্নতা, রান্নার কর্মচারীর বেতনসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ব্যয় তাদের নিজেদের বহন করতে হচ্ছে। এতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। অনেকেই জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েও এ ধরনের খরচ বহন করতে হবেÑ তা তারা আগে জানতেন না।
এ ছাড়া একই ভবনে ছেলে ও মেয়েদের হোস্টেল পরিচালিত হলেও সেখানে কোনো হোস্টেল সুপার নেই। এমনকি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কোনো নিরাপত্তাকর্মীও নিয়োজিত নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে আবাসিক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রানা বলেন, ‘আমরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে এখানে থাকি। কিন্তু হোস্টেলে পর্যাপ্ত তদারকি নেই। নিরাপত্তা নিয়েও সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। আবার বিভিন্ন খরচও নিজেদের বহন করতে হচ্ছে, যা আমাদের জন্য কষ্টকর।’
দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস হয় না। অনেক সময় ক্লাস ঠিকমতো পরিচালিত হয় না, এতে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
শিক্ষার্থীরা আরও জানান, বর্তমানে মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে পুরো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে পাঠদান, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ডা. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, তিনি সপ্তাহে এক-দুদিন অফিসে আসেন এবং অনেক সময় নির্ধারিত সময়েও উপস্থিত থাকেন না। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তবে অধ্যক্ষ মোবাইল ফোনে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ব্যবহারিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে রয়েছেন। প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের জন্য তাদের কয়েক কিলোমিটার দূরে টঙ্গীর শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে যেতে হয়। এতে প্রতিদিন যাতায়াত, খাবার ও অন্যান্য খরচ মেটাতে বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য এ ব্যয় বহন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের মতে, শিক্ষক সংকট, নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বলতা, আবাসন সমস্যা এবং প্রশাসনিক অনিয়ম দ্রুত সমাধান না হলে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম আরও ব্যাহত হবে। একই সঙ্গে নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তির আগ্রহও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, হোস্টেলে নিরাপত্তাকর্মী ও সুপার নিয়োগ, আবাসন ও খাবারের মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সিভিল সার্জনের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন