রাজশাহীতে এইচআইভি সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টার ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত জেলায় মোট ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন।
রামেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ১২ হাজার ৮৫২ জনের পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে ১১৫ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে ১০৫ জন পুরুষ, ৯ জন নারী এবং একজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি। বয়সভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ১৫-২৪ বছর বয়সি ৩৫ জন এবং ২৫-৫০ বছর বয়সি ৮০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া চারজন প্রবাসফেরত ব্যক্তিও আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে সমকামী ৫৮ জন, যৌনকর্মীর সংস্পর্শে আসা ৩৫ জন, সাধারণ জনগোষ্ঠীর ১৪ জন, তৃতীয় লিঙ্গের দুজন, যক্ষ্মা রোগী দুজন এবং একজন যৌনকর্মী রয়েছেন বলে রামেক সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যে হাসপাতালের বাইরে আরও ৩৪ জন আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন, যাদের সবাই সমকামী জনগোষ্ঠীর সদস্য। ফলে দুই সূত্র মিলিয়ে রাজশাহীতে মোট আক্রান্ত ১৩৯ জন, যাদের মধ্যে ৯২ জন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে জানা যায়।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, রাজশাহীসহ পুরো বিভাগে গত কয়েক বছরে এইচআইভি সংক্রমণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভাগীয় তথ্য অনুযায়ী আট জেলায় মোট শনাক্তের সংখ্যা ৭৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জে সর্বোচ্চ ৩১০ জন, রাজশাহীতে ১৩১ জন, বগুড়ায় ১০৯ জন, পাবনায় ৭৮ জন, নওগাঁয় ৬৫ জন, নাটোরে ৪৩ জন, জয়পুরহাটে ৩৭ জন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২১ জন শনাক্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, সচেতনতার অভাব এবং গোপন সামাজিক নেটওয়ার্ক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। পাশাপাশি সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা না নেওয়ার প্রবণতাও পরিস্থিতি জটিল করছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক, পরীক্ষা ছাড়া রক্ত গ্রহণ, একাধিক ব্যক্তির একই সিরিঞ্জ ব্যবহার এবং মা থেকে শিশুর শরীরে এইচআইভি সংক্রমণ হতে পারে। তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এড়ানো এবং নিয়মিত পরীক্ষা করাই প্রতিরোধের মূল উপায়।
এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আপোস’-এর কর্মকর্তা এস এন আব্দুল্লাহ আল রেজা বলেন, সামাজিক বৈষম্যের কারণে অনেক আক্রান্ত চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং থেকে দূরে থাকেন, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করছে।
রামেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টারের মাধ্যমে চিকিৎসা, ওষুধ ও কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে কিছু রোগীর পুরোনো চিকিৎসা নথি অন্য হাসপাতালে থাকায় ফলোআপে জটিলতা রয়েছে।
রামেকের মুখপাত্র ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ বলেন, আক্রান্তদের শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার আওতায় আনা ইতিবাচক অগ্রগতি। বর্তমানে ওষুধ ও সেবার কোনো সংকট নেই এবং রোগীদের নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং সামাজিক বৈষম্য কমানো। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন