মাঠে পারফরম্যান্সের চরম দৈন্য আর রক্ষণভাগের একের পর এক ‘ছেলেমানুষি’ ভুলে ব্রাজিলের কাছে বিধ্বস্ত হয়েছে স্কটল্যান্ড। ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘সি’-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আনচেলত্তির ব্রাজিলের কাছে ৩-০ ব্যবধানে হেরেছে স্টিভ ক্লার্কের দল। দাপুটে জয়ে গ্রুপের শীর্ষে থেকেই নকআউট পর্বে গেল ব্রাজিল। আর হারের পর তিন ম্যাচে ৩ পয়েন্ট এবং মাইনাস ৩ গোলের ব্যবধান নিয়ে স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্বপ্ন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। নকআউট পর্ব তথা শেষ ৩২-এ জায়গা পাওয়ার ভাগ্য এখন আর স্কটিশদের নিজেদের হাতে নেই; তাদের তাকিয়ে থাকতে হবে অন্য গ্রুপগুলোর জটিল সমীকরণের দিকে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় ‘সি’ গ্রুপের ম্যাচে মুখোমুখি হয় ব্রাজিল আর স্কটল্যান্ড। দারুণ পারফরম্যান্সে স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে ব্রাজিল। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচ শেষে ২ জয় আর ১ ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট নিয়ে ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ ৩২-এ গেল ব্রাজিল। সমান ম্যাচে ২ জয় আর ১ ড্রয়ে ব্রাজিলের সমান ৭ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় ২ নম্বরে থেকে নকআউটে গেল মরক্কো।
অন্যদিকে, ১ জয় আর ২ হারে ৩ পয়েন্ট নিয়ে সেরা আট ‘তৃতীয় স্থান’ দল হিসেবে নকআউটে যাওয়ার আশায় স্কটল্যান্ড। আর কোনো পয়েন্ট ছাড়াই এবারের আসর থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেল হাইতির। ম্যাচে প্রথম আক্রমণটা করে ব্রাজিল। পঞ্চম মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠে বক্সের মধ্যে ক্রস বাড়িয়েছিলেন ব্রুনো গিমারায়েস। তার ক্রস ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে খুঁজে নেওয়ার আগেই বল গ্লাভসবন্দি করেন স্কটল্যান্ডের গোলরক্ষক।
ম্যাচের সপ্তম মিনিটে ব্রাজিলকে লিড এনে দেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। ডি-বক্স থেকে সতীর্থকে পাস দিচ্ছিলেন স্কটিশ ডিফেন্ডার। সেখানে চাপ প্রয়োগ করেন রায়ান। বল রায়ানের পায়ে লেগে চলে যায় বক্সেই থাকা ভিনিসিয়াসের কাছে। গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। ম্যাচের ১৯তম মিনিটে আবারও আক্রমণে ওঠে ব্রাজিল। ডান প্রান্ত দিয়ে ওয়ান-টু-ওয়ান পাসিং করে এগিয়ে যান রায়ান আর ভিনিসিয়াস। বক্সের মাথায় থেকে ভিনিসিয়াস শট নিলেও সেটি লক্ষ্যে রাখতে পারেননি।
ম্যাচের ২১তম মিনিটে আবারও স্কটল্যন্ডের জালে বল জড়িয়েছিলেন ভিনিসিয়াস। আবারও বল নিজের পায়ে রেখে সতীর্থকে পাস দিতে গিয়ে ভুল করেন স্কটল্যান্ডের ডিফেন্ডার হেনরি। পেছন থেকে বল কেড়ে নিয়ে গোলরক্ষকে ফাঁকি দিয়ে জাল খুঁজে নেন ভিনি। তবে মিনিটখানেক পরে ভিএআর মনিটর চেক করেন রেফারি। সেখানে দেখা যায় বল কেড়ে নেওয়ার সময় ফাউল করেছিলেন ভিনি। যে কারণে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন রেফারি।
ম্যাচের ২৮তম মিনিটে কর্নার পেয়েছিল স্কটল্যান্ড। তবে সেখান থেকে বিপদ ঘটাতে পারেননি তারা। নির্ভার থেকেই বল বিপদমুক্ত করে ব্রাজিল। এরপর ৩১তম মিনিটে বাম প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ওঠে স্কটল্যান্ড। কর্নারের বিনিময়ে স্কটল্যান্ডের ক্রস আটকান দানিলো। ৩৩তম মিনিটে লুকাস পাকুয়েতার ভুল পাস থেকে বল পেয়ে বক্সের অনেকটা বাইরে থেকে বুলেট গতির শট নিয়েছিল স্কটল্যান্ড। ব্রাজিল ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে সেটি চলে যায় গোললাইনের বাইরে।
ম্যাচের ৩৭তম মিনিটে আবারও বল টেনে নিয়ে গিয়ে শট নিয়েছিলেন রায়ান। তবে সেটি লক্ষ্যে রাখতে পারেননি তিনি। ৪১তম মিনিটে ম্যাথিউস কুনিয়ার বাঁকানো শট চলে যায় গোলবারের একটু বাইরে দিয়ে।
ম্যাচের ৪৪তম মিনিটে গোলের অনেক কাছে চলে গিয়েছিল ব্রাজিল। তবে গোললাইন থেকে বল ক্লিয়ার করে দেন স্কটল্যান্ডের গোলরক্ষক। ডি-বক্সের বাম দিক দিয়ে গোললাইনের কাছে থেকে কাট করে কুনিয়াকে বল দিয়েছিলেন ভিনি। দারুণ ফ্লিক শটে সেটি গোলমুখেও রেখেছিলেন কুনিয়া। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ক্লিয়ার হয়ে যায়।
যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ব্রাজিলের রক্ষণে ভীতি ছড়িয়েছিল স্কটল্যান্ড। ডি-বক্সের মধ্যে দারুণভাবে সেটি ব্লক করেন ক্যাসেমিরো। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ভিনি। বেশ কয়েকবার ক্লিয়ার করার চেষ্টা করেও সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত করতে পারেনি স্কটল্যান্ড। ডি-বক্সের ডান কোনা থেকে ক্রস বাড়ান ব্রুনো গিমারায়েস। হেডে বল জালে পাঠাতে কোনো ভুল করেননি ভিনি।
যোগ করা সময়ের শেষ মিনিটে তৃতীয় গোলের সূবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেন রায়ান। গোলরক্ষককে একা পেয়েও গোল করতে পারেননি তিনি। কিছুটা এগিয়ে এসে সেটি আটকে দেন স্কটল্যান্ডের গোলরক্ষক। পরে ২-০ গোলের লিড নিয়েই বিরতিতে যেতে হয় ব্রাজিলকে।
বিরতি থেকে ফিরে ম্যাচের ৫১তম মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে হ্যাটট্রিক পূরণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন ভিনিসিয়াস। কিন্তু গোলরক্ষককে পরাস্ত করতে পারেননি তিনি। পাকুয়েতার পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বক্সের ভেতরে ঢুকে প্লেসিং শট নিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি গোলরক্ষক আটকে দেন।
ম্যাচের ৫৩তম মিনিটে ব্রাজিলের রক্ষণে ভীতি ছড়িয়েছিল স্কটল্যান্ডও। বল নিয়ে কাট করে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলেন, কিন্তু রক্ষণ ভাঙতে পারেননি। সেটি আটকে দেন দানিলো। ম্যাচের ৬০তম মিনিটে ব্রুনো গিমারায়েসের পাস থেকে ম্যাচের তৃতীয় গোল করেন ম্যাথিউস কুনিয়া। স্কটল্যান্ডের দুই ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে কাট করে বক্সের বাম দিকে গিমারায়েস পাস দেন কুনিয়াকে। দারুণ ফিনিশিংয়ে টুর্নামেন্টে নিজের তৃতীয় গোল করেন ব্রাজিল ফরোয়ার্ড।
ম্যাচের ৬৩তম মিনিটে এসে প্রথম পরীক্ষা দিতে হয় ব্রাজিলের গোলরক্ষক অ্যালিসনকে। বাম প্রান্তে বক্সের ঠিক বাইরে দানিলো ফাউল করলে ফ্রি-কিক পায় স্কটল্যান্ড। সেখান থেকে সরাসরি গোলে শট করেন স্কটল্যান্ডের লুইস ফার্গুসন। সেটি আটকে দেন অ্যালিসন। পরের মিনিটে কর্নার থেকে উঠে বল প্রায় জালে জড়িয়ে দিয়েছিলেন স্কট ম্যাকটনি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেটি আটকে দেন অ্যালিসন।
ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে আসে ব্রাজিলিয়ান ভক্তদের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ম্যাথিউস কুনিয়ার পরিবর্তে মাঠে নামেন নেইমার জুনিয়র। পুরো স্টেডিয়াম জেগে ওঠে করতালির শব্দে। প্রায় তিন বছর পর ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে নামেন তিনি। শেষ দিকে দুই দলই প্রায় সমান সমান আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ করেছে। তবে ডিফেন্স লাইন ভেদ করে বল জালে জড়াতে পারেনি কেউই। ফলে ৩-০ গোলের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে ব্রাজিল।
মাঠে নেমেই রেকর্ড গড়লেন নেইমার : দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জাতীয় দলের জার্সিতে ফিরলেন ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমার জুনিয়র। চোটের কারণে ব্রাজিলের প্রথম দুই ম্যাচে দর্শক হয়ে থাকলেও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তার দেখা মিলল। ম্যাচের ৭৫তম মিনিটে ম্যাথিউস কুনিয়ার বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে যেন পুরোনো ছন্দে ফেরার ইঙ্গিত দিলেন এই তারকা ফরোয়ার্ড। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামলেন তিনি।
আর মাঠে নামার মুহূর্তেই এক অনন্য রেকর্ড গড়েছেন নেইমার। ব্রাজিলের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ১০ নম্বর জার্সিটি পরে গতকাল বিশ্বকাপে নিজের ক্যারিয়ারের ১৪তম ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন নেইমার। এতেই নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। এর আগে কেবল ফুটবল সম্রাট পেলে ও কিংবদন্তি রিভালদো বিশ্বকাপে ১০ নম্বর জার্সি পরে ১৪টি করে ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন। পেলে চার বিশ্বকাপে আর রিভালদো দুই বিশ্বকাপে এই কীর্তি গড়েছিলেন। এবার সেই অভিজাত ক্লাবে নাম লেখালেন নেইমার।
অবশ্য নেইমারের সামনে সুযোগ রয়েছে এককভাবে এই রেকর্ড দখলে নেওয়ার। কারণ, ব্রাজিল ইতোমধ্যে নকআউটে কোয়ালিফাই করেছে। ফলে আগামী ম্যাচে নেইমার মাঠে নামলেই এই কীর্তি এককভাবে নিজের করে নেবেন। নেইমারের এই মাইলফলক ছুঁতে লেগেছে চারটি বিশ্বকাপ। ২০১৪ বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচ, ২০১৮ বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচ, ২০২২ সালে তিন ম্যাচ এবং চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত এক ম্যাচ মিলিয়ে মোট ১৪ বার তিনি ১০ নম্বর জার্সিতে বিশ্বকাপে মাঠে নামলেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন