হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গঠিত হয়েছে উচ্চপর্যায়ের কমিটি। সেই কমিটির তালিকায় আছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। কিন্তু নেই শ্রম, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। আর এই থাকা-না-থাকাকে কেন্দ্র করে সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে গুঞ্জন ও আলোচনার ঝড় উঠেছে। মাজারের দানবাক্স সিলগালা এবং বিদায়ি জেলা প্রশাসকের নাটকীয় প্রত্যাহারের রেশ কাটতে না কাটতে এই কমিটি গঠন এবং সেখানে আরিফুল হক চৌধুরীর অনুপস্থিতি স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এর মাধ্যমে সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও ভাবাবেগের কেন্দ্রবিন্দু হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের দানবাক্সের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা নাটকীয়তা রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক মেরূকরণে।
মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গেল শুক্রবার সকালে সিলেট সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে ১২ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ঘোষণা করা হয়। বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিকে আগামী এক মাসের মধ্যে একটি যুগোপযোগী ও যৌক্তিক কাঠামো নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই কমিটিকে ঘিরে মাজারের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনের দুই হেভিওয়েট নেতার মধ্যকার অলিখিত দ্বৈরথ।
সিলেট বিএনপিতে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও আরিফুল হক চৌধুরীর রয়েছে নিজস্ব ও শক্তিশালী বলয় এবং দুজনেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম উপদেষ্টা। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির পর খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেট-১ এবং আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-৪ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন এবং দুজনেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। মন্ত্রী হওয়ার পর দুজনের কোন্দল প্রকাশ্যে না এলেও মাজারের মতো একটি স্পর্শকাতর ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের কমিটিকে কেন্দ্র করে তা নতুন করে সামনে এসেছে। নবগঠিত ১২ সদস্যের কমিটিতে বাণিজ্যমন্ত্রী মুক্তাদিরের ঠাঁই হলেও জায়গা পাননি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের টানা দুবারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, কমিটি গঠনের মাত্র দুই দিন আগে আরিফুল হক চৌধুরী নিজেই সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে মাজার নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। গত বুধবার মালয়েশিয়া সফর শেষে সিলেটে এসে মাজারসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছিলেন, এ ব্যাপারে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। আমরাও মাজারে স্বচ্ছতা আনতে চাই। শিগগিরই এ ব্যাপারে সিলেটের সব এমপি, জনপ্রতিনিধিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা ও সুশীল সমাজের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে মাজারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আরিফুল হকের এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বিত আশ্বাসের মাত্র দুই দিন পরই শুক্রবার সকালে সিলেটের সার্কিট হাউসে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সেই বৈঠকেই মাজারের ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন এবং আর্থিক স্বচ্ছতা আনার প্রক্রিয়া ঠিক করতে ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়, যেখানে আরিফুল হক চৌধুরীকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের সময় তিনি সিলেটে অবস্থান করা সত্ত্বেও তার কোনো সম্পৃক্ততা না থাকা নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হয়েছে।
দীর্ঘদিনের সফল মেয়র এবং অতীতে মাজারের বিভিন্ন উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা আরিফুল হক চৌধুরীকে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত না করায় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে বিএনপির এক নেতার দাবি, আরিফুল হক চৌধুরী নিজেই কমিটিতে থাকতে চাননি। মাজারের খাদেম ও আলোচিত মোতোয়াল্লি সামুন মাহমুদ খানের সঙ্গে তার গভীর সখ্যের বিষয়টি যাতে তাকে নেতিবাচক কোনো আলোচনায় না ফেলে, সে জন্য তিনি নিজে থেকেই দূরে থেকেছেন। তবে এ দাবির সত্যতা মেলেনি।
কমিটির সদস্যদের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমলাতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদের বাইরে রাজনৈতিকভাবে যারা যুক্ত হয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই স্থানীয় রাজনীতিতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। এই ১২ সদস্যের কমিটিতে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে রয়েছেন সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসক রেজাউল হাসান কয়েস লোদী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। দুজনেই স্থানীয়ভাবে মুক্তাদিরের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত থাকায় এই কমিটিতে তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া সরকারি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের শামীম, সিলেটের ডিআইজি, সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার এবং সিলেটের জেলা প্রশাসক, যিনি কমিটির সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এর বাইরে মাজারের মোতোয়াল্লি পরিবারের দুজন এবং মাজার, মাদ্রাসা ও মসজিদের দুজন প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কমিটিতে আরিফুল হক চৌধুরীকে না রাখার তীব্র সমালোচনা করে অনেকে মন্তব্য করেন, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার কোনো সংসদীয় আসনের বিষয় নয়, কোনো রাজনৈতিক বলয়ের সম্পদও নয়। এটি সিলেটের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এবং জাতির আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অংশ। তবু মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় গঠিত ১২ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটিতে স্থান হয়নি সিলেটের দুবারের নির্বাচিত সাবেক মেয়র, বর্তমান সংসদ সদস্য এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর। প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; প্রশ্নটি নীতি, প্রতিনিধিত্ব ও অন্তর্ভুক্তিকে ঘিরে। যে মাজার কোনো সংসদীয় আসনের বিষয়ই নয়, সেই মাজারের ব্যবস্থাপনায় সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধির জন্যও যদি জায়গা না হয়, তাহলে সেই কমিটির প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদ- নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় অংশীজনদের উপেক্ষা করে নেওয়া সিদ্ধান্তকে ‘স্বচ্ছতা’ বলা সহজ, কিন্তু জনমতের আদালতে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা ততটা সহজ নয়।
এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের পটভূমি তৈরি হয়েছিল গত ১২ জুন, যখন তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমের আকস্মিক মাজার পরিদর্শন এবং আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ঘোষণার মাধ্যমে ঘটনার সূত্রপাত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন মাজারে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপনসহ ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ ও একটি দানবাক্স সিলগালা করে দেয় জেলা প্রশাসন। মাজারের অভ্যন্তরীণ ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে প্রশাসনের এমন হস্তক্ষেপে যখন দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, ঠিক তখনই এর প্রতিবাদ জানিয়ে দেশ-বিদেশের ৬৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক এক যৌথ বিবৃতি দেন। তারা মাজার সংস্কৃতিবিরোধী যেকোনো পদক্ষেপ থেকে সরে আসতে জেলা প্রশাসনকে আহ্বান জানান। এই বড় ধরনের বিতর্কের মধ্যেই গত রোববার বিকেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিসি সারওয়ার আলমকে আকস্মিক প্রত্যাহার করে। তবে ডিসিকে প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং তাকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে সিলেটের বিভিন্ন সংগঠন রাজপথে বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করে, যা পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তবে নাটকীয়তার শেষ এখানেই ছিল না। প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন জারির পরদিন, ২২ জুন বিদায়ি ডিসির নির্দেশনায় সিলগালা করা ডেগ ও বাক্সগুলো খোলা হয়। ৭০০ বছরের প্রাচীন প্রথা ভেঙে প্রথমবারের মতো মাজারের দানের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হয়। মাত্র চার দিনেরও কম সময়ে জমাকৃত সেই অর্থ থেকে বেরিয়ে আসে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা নগদ, ৭ আনা স্বর্ণালংকার এবং ১০ সৌদি রিয়াল। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মাজারের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয় এবং তখন থেকেই মাজারের আয়ের স্বচ্ছতার বিষয়টি মূল আলোচনায় চলে আসে। তবে টাকা গণনাকারীরা জানান, প্রাপ্ত টাকার বেশির ভাগই ছিল ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট। মাত্র চার দিনে এত বিপুল পরিমাণ বড় নোটের আধিক্যের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই টাকার সুনির্দিষ্ট উৎস ও দানকারীদের পরিচয় সম্পর্কেও নতুন করে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
বিদায়ি ডিসির এই কঠোর পদক্ষেপ এবং তার প্রত্যাহার নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা কাটিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির শুক্রবার এক বৈঠকে জানান, সরকার অতীতের কোনো বিতর্ক বা একক সিদ্ধান্তে বিশ্বাসী নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা পেছনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না, সামনে এগিয়ে যেতে চাই। তবে কাজ করার দুটি পদ্ধতি আছেÑ একটি হলো কাজ করা, আরেকটি হলো সবাইকে নিয়ে কাজ করা, যাতে সবার অংশগ্রহণ থাকে এবং কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয়। আমরা সে রকম উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে স্বচ্ছতাও আসবে, সবার অংশগ্রহণও থাকবে। তিনি আশ্বস্ত করেন, নতুন কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত মাজারের বিদ্যমান কমিটিই প্রচলিত নিয়মে টাকা গণনা করবে এবং তা মাজারের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থাকবে। পুরো প্রক্রিয়ায় মাজার কর্তৃপক্ষও ঐকমত্য প্রকাশ করেছে।
আপাতদৃষ্টিতে মাজারের বিপুল অঙ্কের দানের টাকার একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা তৈরি হওয়াকে সিলেটের সাধারণ মানুষ স্বাগত জানালেও কমিটির ভেতরের রাজনৈতিক সমীকরণ ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্থানীয় সুশীল সমাজের মতে, মাজারের অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত মাজারের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে, নাকি অংশীজনদের উপেক্ষা করার কারণে সিলেটের দুই মন্ত্রীর ভেতরের অলিখিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বিভেদকে আরও উসকে দেবে, তা সময়ই বলে দেবে।
কমিটি গঠন প্রসঙ্গে গতকাল শনিবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক কমিটি নয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে শুধু আমি আছি। অনেকে এখানে বিভাজনের গন্ধ খুঁজছেন, কিন্তু বিভাজনের কী আছে এখানে? বিভাগীয় কমিশনার, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান, ডিআইজি পুলিশ কমিশনার এবং ডিসি রয়েছেন এই কমিটিতে। মাত্র এক মাসের এই কমিটিতে সংসদ সদস্য হিসেবে শুধু আমি রয়েছি। সবাই চাইছেন স্বচ্ছতা। এখানে রাজনীতি টেনে গোলাটে করার তো কিছু নেই।
মন্ত্রী বললেন, এক মাস পর মাজারের দানের টাকা এই কমিটির সব সদস্যের সামনে প্রকাশ্যে গণনা করা হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন