বাংলাদেশে বিয়ে ভাঙার অনেক কারণ আছে। কেউ বলে কাবিন, কেউ বলে শ্বশুরবাড়ি, কেউ বলে স্বভাবের অমিল, আবার যৌতুক নিয়েও আছে। আবার এমনও ঘটেÑ কোনো একজনের পুরোনো প্রেমিকের নাক গলানো বা গোপন রহস্য ফাঁস করে দেওয়া। কিন্তু বিশ্বকাপের বছরে নতুন একটা কারণ যোগ হতে পারে। বর ব্রাজিল, কনে আর্জেন্টিনা। ফলে বর আর কনে পক্ষ উভয়ই সতর্ক থাকবেন।
কল্পনায় একটি বিয়ের কথা ধরেই এগোতে চাই। এই বিয়ে যে সহজ হবে না, সেটা পাকা কথা হওয়ার দিনই বোঝা গিয়েছিল। পাত্র হলুদ আলী। ছোটবেলা থেকে ব্রাজিল সমর্থক। এতটাই যে, ক্লাস থ্রিতে রচনা লিখেছিলÑ ‘আমার প্রিয় দেশ ব্রাজিল’। শিক্ষক খাতায় লিখেছিলেন, ‘তুমি পাবনাতে জন্মেছ, এটা ভুলে গেছো?’ অন্যদিকে কনের নাম আকাশি বেগম। জন্মের সময় নাকি কান্নাও করেছিল আকাশি-সাদা আবেগ নিয়ে। তার বাবা দাবি করেন, মেয়ের প্রথম মুখে উচ্চারিত শব্দ ‘মা’ নয়, ‘মেসি’। পরিবারের সবাই জানে, এই তথ্যের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির চেয়ে আবেগের ভিত্তি বেশি শক্ত।
কোনো এক রেস্টুরেন্টে দুই পরিবারের দেখা করার দিন সবাই ভেবেছিল, আলোচনা হবে গয়না, কমিউনিটি সেন্টার আর কাবিন নিয়ে। কিন্তু প্রথম দশ মিনিটেই আলোচনার বিষয় হয়ে গেলÑ ভিনিসিয়ুস নাকি আলভারেজ? পাত্রপক্ষের এক চাচা ঘোষণা দিলেন, ‘ফুটবলের ইতিহাস শুরু হয়েছিল ব্রাজিল দিয়ে।’ কনেপক্ষের এক মামা মুচকি হেসে বললেন, ‘ইতিহাস শুরু হতে পারে, কিন্তু বর্তমানে বাস করতে হয়।’ তারপর চা ঠান্ডা হলো, কিন্তু তর্ক ঠান্ডা হলো না।
মেন্যু নিয়ে আলোচনার সময় ক্যাটারার সাহস করে জিজ্ঞেস করল, ‘গরু দেব, নাকি খাসি?’ দুই পক্ষ একসঙ্গে তাকাল। ‘আপনি আগে বলেন, কোন দলের?’ লোকটা এমন ঘাবড়ে গেল যে বলল, ‘আমি ভলিবল দেখি।’ সেদিন থেকেই ক্যাটারারের প্রতি দুই পরিবারের অদ্ভুত শ্রদ্ধা জন্মাল। নিরপেক্ষ মানুষ আজকাল বিরল।
বিয়ের কার্ড ছাপাতে গিয়ে নতুন বিপদ। পাত্রপক্ষ চাইল কার্ডে হলুদ নকশা। কনেপক্ষ বলল, আকাশি হবে। প্রিন্টিং প্রেসের মালিক বুদ্ধি করে ধূসর রং ব্যবহার করলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই সম্ভবত প্রথম বিয়ে, যেখানে ধূসর রংকে শান্তির প্রতীক ঘোষণা করা হলো।
এদিকে পাড়ায় শুরু হয়ে গেছে পতাকা যুদ্ধ। বরের বাসায় ২৫ ফুট ব্রাজিল। কনের বাসায় ৩০ ফুট আর্জেন্টিনা। বরপক্ষ রাতের অন্ধকারে আরও লম্বা বাঁশ কিনে আনল। কনেপক্ষ ভোরে আনল আরেকটা বাঁশ। শেষ পর্যন্ত দুই পতাকা এত উঁচু হলো যে, পাড়ার এক বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখানে বিয়ে হচ্ছে, না মহাকাশ নিয়ে গবেষণা?’ বৃদ্ধ যা-ই বলুক, বাঁশওয়ালার মুখে হাসি। সে বলল, ‘ফিফা চার বছর পর পর আসে, কিন্তু আমার ঈদও তখনই হয়।’
সবচেয়ে বিপদে পড়লেন কাজী সাহেব। কাবিননামা লিখতে বসে তিনি জীবনে প্রথম দেখলেন, কাবিনের শর্তের চেয়ে ফুটবলের শর্ত বেশি। আকাশি লিখিয়ে নিলÑ “বিশ্বকাপে ব্রাজিল হারলে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা কনেকে কোনো প্রকার খোঁচা, ট্রল, মিম, স্টিকার বা ‘বলেছিলাম’ বলা যাবে না।” হলুদও ছাড়ার পাত্র নয়। সে লিখিয়ে নিলÑ “আর্জেন্টিনা হারলে ‘মেসি শেষ’Ñ এই বাক্য উচ্চারণ করলে তা মানসিক নির্যাতন হিসেবে গণ্য হবে।” কাজী সাহেব কাবিননামা বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কাজী অবাক। এত দিন ভেবেছিলেন, ইসলামি পারিবারিক আইনে সব ধারা আছে। আজ বুঝলেন, বাংলাদেশে বিশ্বকাপের জন্য আলাদা সংবিধান দরকার।
বিয়ের দিন সকাল থেকেই অতিথিরা আসছেন। কেউ সালাম দিচ্ছেন না। প্রথম প্রশ্নÑ ‘কোন দলের?’ একজন বললেন, ‘আমি ব্রাজিল।’ তাকে সঙ্গে সঙ্গে হলুদ শরবত দেওয়া হলো। আরেকজন বললেন, ‘আমি আর্জেন্টিনা।’ তার হাতে গেল নীল গ্লাস। যিনি বললেন, ‘আমি নিরপেক্ষ’Ñ তার ভাগ্যে পড়ল শুধু পানি। বাংলাদেশে নিরপেক্ষ থাকারও শাস্তি আছে।
ফটোগ্রাফার সবাইকে একসঙ্গে দাঁড় করাতে গিয়ে বিপদে পড়লেন। ব্রাজিল পক্ষ এক পাশে। আর্জেন্টিনা অন্য পাশে। মাঝখানে ফাঁকা। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, মাঝখানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী দাঁড়ানোর কথা ছিল।
ডিজে বাজনা নিয়ে মহা ঝামেলা। কী বাজবেÑ সাম্বা না অন্য কিছু? মিউজিশিয়ান আত্মরক্ষার্থে বললেন, ‘আমি এখন থেকে শুধু রবীন্দ্রসংগীত বাজাব।’ এটাই ছিল তার আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা।
ঠিক তখনই মোবাইলে ম্যাচের নোটিফিকেশন। পুরো বিয়ে থেমে গেল। কনে বসে আছে। বর বসে আছে। কাজী সাহেব বসে আছেন। সবার চোখ মোবাইলে। কাজী সাহেব বোধ হয় এবারই জীবনে প্রথমবারের মতো বললেন, ‘কবুল একটু পরে নিলেও হবে...আগে স্কোরটা দেখি।’ প্রথম গোল হতেই বরপক্ষের অর্ধেক উঠে দাঁড়াল। অন্য অর্ধেক বলল, ‘ভিএআর দেখুক!’ বাংলাদেশে গোলের চেয়ে ভিএআরের ওপর মানুষের বিশ্বাস বেশি। ভিএআর বলল, গোল। এক পক্ষ নাচল। অন্য পক্ষ বলল, ‘এই টিভিটা ঠিক না।’ এক চাচা এত রেগে গেলেন যে বিরিয়ানির প্লেট নামিয়ে রেখে ঘোষণা দিলেন, ‘আজ আমি শুধু জর্দা খাব!’ কেন? কেউ জানে না। বিশ্বকাপে অনেক সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা থাকে না।
খেলা যত এগোয়, বিয়ে তত পিছোয়। কনের খালা বললেন, ‘এত দেরি কেন?’ পাশ থেকে উত্তর এলো, ‘অতিরিক্ত সময় চলছে।’ কাজী সাহেবও হাল ছেড়ে দিলেন। তিনি কাবিননামায় লেখা বন্ধ করে খেলা দেখতে শুরু করলেন। এমনকি একবার নাকি ভুল করে বলে ফেললেন, ‘আল্লাহ, একটা গোল...’ তারপর মনে পড়ল, তিনি তো নিরপেক্ষ থাকার কথা!
শেষ পর্যন্ত ম্যাচ শেষ হলো। বিয়ে? না, হলো না। মানে বিয়ে পর্ব হলো না। বর বা কনে দুজনই বেহুঁশ। একজন আনন্দে চিৎকার করতে গিয়ে, আরেকজন কাঁদতে কাঁদতে। কাজীও বেহুঁশ, বিয়ে না পড়াতে পেরে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন