ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও মেধার সমন্বয় ঘটলে সীমিত সুযোগ-সুবিধাও যে বড় সাফল্যের পথ খুলে দিতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে টাঙ্গাইলের পাঁচ মাদ্রাসাছাত্রী। আধুনিক জীবপ্রযুক্তির ধারণাকে কাজে লাগিয়ে তারা এমন একটি তাত্ত্বিক গবেষণা মডেল তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে কলার স্বাদ অপরিবর্তিত রেখে এর প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি বাস্তবে সফল হলে দেশের অপুষ্টি দূরীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই উদ্ভাবনী দলের সদস্যরা হলেন টাঙ্গাইলের কুরতুবী মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমাতুজ জহুরা, অনামিকা আলফী আমরি, মিফতাহুল জান্নাত মায়া, মেঘলা আক্তার ও ফারজানা আক্তার।
জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ মাসে জীববিজ্ঞানের ল্যাব ক্লাসে ডিএনএ প্রযুক্তি নিয়ে পাঠ গ্রহণের সময় তাদের মাথায় নতুন এই ধারণার জন্ম হয়। তারা লক্ষ করেন, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হলেও সাধারণ কলায় মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড লাইসিনের পরিমাণ তুলনামূলক কম। সেই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্য নিয়েই শিক্ষক আরিফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে তারা গবেষণা শুরু করেন।
দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ধারণা এবং ল্যাবভিত্তিক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা একটি গবেষণা মডেল তৈরি করেন। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় ‘প্রোটিনসমৃদ্ধ কলা তৈরির জন্য কলার ডিএনএ নিষ্কাশন ও রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ মডেল’।
গবেষণায় প্রোটিনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বহুল পরিচিত মসুর ডাল। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মসুর ডাল থেকে ডিএইচডিপিএস (উঐউচঝ) জিন নির্বাচন করা হয়েছে, যা লাইসিন উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাদের তাত্ত্বিক মডেলে দেখানো হয়েছে, এই জিনটি কলার ডিএনএর সঙ্গে সংযুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ কলা উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
প্রকল্পের প্রাথমিক ধাপে পাকা কলা, লবণ, গরম পানি, ডিশ ওয়াশিং লিকুইড, ব্লেন্ডার, কফি ফিল্টার ও ইথানলের মতো সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে কলার ডিএনএ নিষ্কাশনের পদ্ধতি উপস্থাপন করা হয়। এরপর আধুনিক রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তির ধারণার ভিত্তিতে জিন সংযোজনের একটি তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করা হয়।
এই গবেষণা প্রকল্প টাঙ্গাইল সদর উপজেলা বিজ্ঞান মেলা ও জেলা বিজ্ঞান মেলায় প্রথম স্থান অর্জন করে। পরে বিভাগীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। সেখানে বিজ্ঞানীদের কাছ থেকেও প্রশংসা অর্জন করে প্রকল্পটি।
গবেষক দলের সদস্য অনামিকা আলফী আমরি বলেন, বাংলাদেশে এখনো শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং গর্ভবতী নারীদের মধ্যে প্রোটিনের ঘাটতিজনিত অপুষ্টি একটি বড় সমস্যা। তাদের গবেষণার ধারণা বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মিফতাহুল জান্নাত মায়া বলেন, কলা দেশের অন্যতম সহজলভ্য ফল। যদি এটিকে প্রোটিনসমৃদ্ধ করা সম্ভব হয়, তাহলে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পুষ্টির ঘাটতি পূরণে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ফাতেমাতুজ জহুরা বলেন, কৃত্রিম খাদ্য সম্পূরক বা রাসায়নিকের ওপর নির্ভর না করে প্রাকৃতিক খাদ্যের পুষ্টিমান বাড়ানোর চিন্তাই তাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য।
মেঘলা আক্তার বলেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের কলা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন সম্ভব হলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা তৈরি হতে পারে।
তবে শিক্ষার্থীরা জানান, উন্নত গবেষণাগারের অভাব, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত খাদ্য নিয়ে সামাজিক বিতর্কের মতো বিষয়গুলো তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক আরিফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ পেলে তারা আরও বড় গবেষণা করতে সক্ষম হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তারা দেখিয়েছে, কীভাবে জিন ট্রান্সফারের ধারণা ব্যবহার করে অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডসমৃদ্ধ প্রোটিন উৎপাদনের একটি তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করা যায়।
কুরতুবী আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. রেজাউল করিম বলেন, দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষায়ও শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। ভবিষ্যতেও গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ খান বলেন, এই সাফল্য শুধু প্রতিষ্ঠানের নয়, দেশেরও গর্ব। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীদের এই গবেষণা এখনো একটি তাত্ত্বিক মডেল। এটি বাস্তবে প্রয়োগের আগে উন্নত গবেষণাগারে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা, নিরাপত্তা মূল্যায়ন, বৈজ্ঞানিক যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। তবে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও পাঁচ তরুণীর এই উদ্যোগ দেশের তরুণ প্রজন্মের বিজ্ঞানচর্চা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার একটি আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন