ঢাকা ঘুমায় না। রাত যত গভীর হয়, রাজধানীর কিছু এলাকায় ততই সক্রিয় হয়ে ওঠে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র। ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যাকা- কিংবা মাদকের চালান। অপরাধ ঘটিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই রাজধানীর সীমানা পেরিয়ে যায় অপরাধীরা। এরপর শুরু হয় পুলিশের দীর্ঘ অনুসন্ধান। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে যেতে হয় কয়েকশ কিলোমিটার দূরের জেলায়।
সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত অপরাধের তদন্তে এমন একটি প্রবণতা সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা একে বলছেন, ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশল। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ, অপরাধ সংঘটন, তারপর দ্রুত জেলা সীমানা অতিক্রম করে আত্মগোপন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ঢাকায় যেসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এর ৬০ শতাংশ ঘটাচ্ছে বাইরের অপরাধীরা। তারা অপরাধ সংঘটনের পর মুহূর্তেই ঢাকার বাইরে চলে যায়। নিরাপদ ও গোপন স্থানে গিয়ে আত্মগোপন করে। যে কারণে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ভাসমান অপরাধীদের বিষয়ে একটি বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকে জানানো হয়, ভাসমান অপরাধীদের একটি তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন তৎকালীন আইজিপি। এরপর যে তালিকা তৈরি হয়েছিল সেখানে ভাসমান অপরাধীর সংখ্যা ছিল এক লক্ষাধিক। এরপর আর কোনো ভাসমান অপরাধীর তালিকা তৈরি হয়নি। জানাও যায়নি এই শ্রেণির অপরাধীর সংখ্যা এখন কত। তবে ভাসমান অপরাধীদের প্রকৃত সংখ্যা এখন আরও অনেক বেশি।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীকে ঘিরে থাকা প্রধান কয়েকটি সড়ক, সেতু ও জলপথ এখন সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভৌগোলিকভাবে সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি সংযোগ থাকায় এসব রুটে নজরদারির ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর নিরাপত্তা শুধু ঢাকার ভেতরের টহল বা চেকপোস্টের ওপর নির্ভর করে না। শহরে প্রবেশ ও বের হওয়ার প্রধান করিডোরগুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন কঠিন হয়ে পড়ে।
তাদের ভাষ্য, আব্দুল্লাহপুর-টঙ্গী করিডোর, আশুলিয়া-বেড়িবাঁধ, গাবতলী-আমিনবাজার, বসিলা সেতু, বাবুবাজার ও পোস্তগোলা সেতু, সদরঘাট জলপথ, কাঁচপুর সেতু এবং ডেমরা করিডোরসহ রাজধানীর চারপাশের অন্তত দশটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। এই স্বাভাবিক জনস্রোতের আড়ালেই অনেক সময় সংঘবদ্ধ অপরাধীরা রাজধানীতে ঢুকে আবার দ্রুত বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরে অপরাধ ঘটিয়ে অধিকাংশ অপরাধী গিয়ে আশ্রয় নেয় কেরানীগঞ্জে। এ ছাড়া কামরাঙ্গীচরে যারা চাঁদাবাজি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ করে তারা বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন গোপন আস্তানায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। কুড়িল-বিশ^রোড থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত সক্রিয় ছিনতাইকারী, ডাকাত ও পকেটমারচক্রের সদস্যরা অপরাধ ঘটিয়ে চলে যায় টঙ্গীর মাজার বস্তিসহ বিভিন্ন বস্তিতে। সেখানে ভাড়া করা গোপন কুঠুরিতে নিরাপদে অবস্থান করে অপরাধীরা। এ ছাড়া আন্তঃজেলা ডাকাতদল ঢাকায় অপরাধ ঘটিয়ে অবস্থান নেয় শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়।
ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, অনেক ঘটনায় দেখা যায়, অপরাধ সংঘটনের পর অভিযুক্তরা দ্রুত জেলা সীমানায় চলে যায়। তখন তদন্তের দায়িত্ব, তথ্য সমন্বয় এবং অভিযান পরিচালনায় একাধিক ইউনিট ও জেলার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। এতে গ্রেপ্তারে সময় বেড়ে যায়।
সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারে আলোচিত এলেক্স ইমন হত্যা মামলার তদন্তেও এমন চিত্র দেখা যায়। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনার পর অভিযুক্তরা রাজধানী ছেড়ে বিভিন্ন জেলা হয়ে আত্মগোপনে যায়। পরে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন মাস থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এগারো মাসে রাজধানীর ৫০ থানায় ১৮ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৫ হাজার জনকে। পুলিশের হিসাবে এই সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ৩৭১টি। যদিও প্রকৃত চিত্র এর বহুগুণ বেশি। এ ছাড়া ৩৬টি ডাকাতি, ৩৪৪টি খুন ও ২৩৫টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এসবসহ অন্তত ১৫ ধরনের অপরাধের চিত্র পুলিশের খাতায় লিপিবদ্ধ আছে।
পুলিশ বলছে, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হওয়ায় মামলার সংখ্যা বেড়েছে। মাদক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে তারা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। তবে পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধীদের দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসা। পুলিশ বলছে, অনেক দুর্ধর্ষ অপরাধী গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ের মধ্যেই আইনের ফাঁক গলে মুক্ত হয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণের ঘাটতি এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়াও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। রাজধানীর বিশাল জনসংখ্যা ও অপরিচিত সামাজিক পরিবেশে বহিরাগতদের শনাক্ত করা কঠিন। এ ছাড়া মহানগর ও জেলা পুলিশের প্রশাসনিক সীমানা আলাদা হওয়ায় অনেক সময় তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময় ও সমন্বয়ে সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। অন্যদিকে রাজধানীর সব প্রবেশপথ এখনো সমান প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আওতায় আসেনি।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের মতে, শুধু অপরাধ সংঘটনের পর অভিযান চালালেই হবে না। রাজধানীতে প্রবেশ ও বের হওয়ার করিডোরগুলোকে স্মার্ট নজরদারির আওতায় আনতে হবে। তার মতে, এআইভিত্তিক ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ (এএনপিআর), আন্তঃজেলা রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত অপরাধ তথ্যভা-ার চালু করা গেলে সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলা অনেক সহজ হবে।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, রাজধানীর অনেক অপরাধই এখন আন্তঃজেলা চক্রের মাধ্যমে সংঘটিত হচ্ছে। ঢাকার আশপাশের এলাকা থেকে অপরাধীরা ঢাকায় এসে নির্দিষ্ট টার্গেটকে আঘাত করে দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় নিয়মিত ‘ব্লক রেইড’ পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাজধানীর নিরাপত্তা ও ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে এআই ক্যামেরা স্থাপন অব্যাহত আছে। প্রতিটি প্রবেশমুখেও এই প্রযুক্তি সম্বলিত ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নগরবাসীকে নিরাপদ রাখতে যা যা প্রয়োজন সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের বড় শহরগুলোতে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সমন্বিত পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। দিল্লিতে আন্তঃরাজ্য সমন্বয় ইউনিট, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে রিয়েল-টাইম অপরাধ তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় নজরদারি প্রযুক্তি অপরাধী শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, রাজধানীকে নিরাপদ করতে জরুরি কয়েকটি পদক্ষেপ হলোÑ ডিএমপি ও আশপাশের জেলা পুলিশ নিয়ে স্থায়ী যৌথ টাস্কফোর্স। রাজধানীর প্রধান প্রবেশপথে এআইভিত্তিক স্মার্ট ক্যামেরা ও এএনপিআর প্রযুক্তি। সব থানাকে একীভূত জাতীয় অপরাধ তথ্যভা-ারের সঙ্গে যুক্ত করা। আন্তঃজেলা গোয়েন্দা তথ্য দ্রুত বিনিময়ের ব্যবস্থা জোরদার করা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার নিরাপত্তা শুধু রাজধানীর ভেতরের টহল বাড়িয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অপরাধীরা যদি সহজেই শহরে ঢুকতে এবং অপরাধ শেষে দ্রুত জেলা সীমানা পেরিয়ে যেতে পারে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই রাজধানীর নিরাপত্তার আসল চ্যালেঞ্জ এখন শুধু শহরের ভেতরে নয়, বরং চারপাশের প্রবেশপথগুলোকে কার্যকর প্রযুক্তি, সমন্বিত নজরদারি এবং যৌথ অভিযানের আওতায় নিয়ে আসা। তবেই অপরাধীদের এই তথাকথিত ‘সেফ প্যাসেজ’ সংকুচিত করা সম্ভব হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন