সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে মো. মশিউর নামে এক কারারক্ষীকে মাদক সেবনরত অবস্থায় দেখা যায়। তিনি নিজে সেবনের পাশাপাশি বন্দিদের কাছে মাদক বিক্রি করেন। সাম্প্রতিক এই ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে কারা প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। মো. মশিউর কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্মরত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ৯টি বিভাগীয় মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে কর্তৃপক্ষ। এর আগে গত বছরের ১৬ জুন নীলফামারী জেলা কারাগারে দায়িত্ব পালনের জন্য ঢোকার সময় কারারক্ষী সালমান শাহকে আটক করা হয়। তার প্যান্টের ভেতরে গাঁজা পাওয়া যায়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলার পর তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে কারা কর্তৃপক্ষ। তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়। এদিকে খুলনার শীর্ষসন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত নূর আজিমকে গত বছরের ২ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারে থেকে তিনি ফোনে চাঁদাবাজি করছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর খুলনা জেলা কারাগারে তার সেলে তল্লাশি করে মোবাইল ফোনের পাশাপাশি মাদকও পাওয়া যায়। এই কারাগারে ২০২৪ সালেও সজীব ইসলাম নামে এক বন্দির কাছ থেকে ১৯ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ওই বছরই কারাগারে থাকা আরেক সন্ত্রাসী সাগর বিশ্বাস ওরফে হাড্ডি সাগরের কাছে গাঁজা পাওয়া যায়।
কারাগারের ভেতরে এসব ঘটনা এখন নিত্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সময় মাদক পাচার ও সেবনের অভিযোগে একাধিক কারারক্ষী গ্রেপ্তারও হচ্ছেন। কারাগারে মাদকের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও থেমে নেই এসব অপরাধ।
কারাগারগুলোতে বন্দিদের ৪০ শতাংশই মাদকসংক্রান্ত মামলার আসামি। এর মধ্যে কেউ ব্যবসায়ী, কেউ বহনকারী, আবার কেউ সেবনকারী। মূলত এসব আসামিকে যখন মামলার হাজিরার কারণে আদালতে নেওয়া হয়, সেখান থেকে ফেরত আসার সময় তারা কৌশলে মাদক নিয়ে প্রবেশ করে। এ ছাড়া বন্দিদের দেখতে আসা দর্শনার্থীদের মাধ্যমে কারাগারে মাদক আসে। ৯০ শতাংশ মাদক কারাগারে আসা আসামিদের মাধ্যমে এলেও ১০ শতাংশ মাদক কারগারের কর্মকর্তা, কারারক্ষী এবং কর্মচারীদের মাধ্যমেও আসে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। গত দুই বছরে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৯৯৬ জন কারা কর্মকর্তা, কারারক্ষী ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে কারা অধিদপ্তর।
সূত্রমতে, সাম্প্রতিক কাশিমপুর কারাগারে প্যান্টের ভেতরে স্কচটেপে মোড়ানো গাঁজা ও ইয়াবাসহ কারারক্ষী সবুজ হাসান কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে বের হন এবং ৩২৮ পিস ইয়াবাসহ পিন্টু মিয়া কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ থেকে গ্রেপ্তার হন। এর আগে প্রধান কারারক্ষী সাইফুল ইসলামকে ৩০০ পিস ইয়াবাসহ আটক করে পুলিশে দেওয়া হয়। এ ছাড়া কারারক্ষী মশিউরের মাদক সেবনের ভিডিও প্রকাশের পর তাকে বরখাস্ত করা হয়। ইয়াবা বিক্রির অভিযোগে ডিবির হাতে কারারক্ষী শামীম মিয়া গ্রেপ্তার হন।
কারা অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, দেশের ৬৮টি কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা ৪২ হাজার ৮৬৬ জন। অন্যদিকে কারাগারগুলোতে বর্তমানে মোট বন্দি আছেন ৭৭ হাজার ২০৩ জন, যা ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে বন্দিদের এক-তৃতীয়াংশই মাদক মামলার আসামি। অর্থাৎ, তাদের সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার।
কারা সূত্র আরও জানায়, ২০২৪ সালের ২০ মে থেকে চলতি বছরের ২০ মে পর্যন্ত দুই বছরে মাদকসংশ্লিষ্টতায় সাজা পেয়েছেন ৩ হাজার ৬১৭ জন। এর মধ্যে ৫৭ জন ছিলেন কারারক্ষী, যাদের ২৮ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অন্যদের বিভিন্ন ধরনের গুরু ও লঘুদ- দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে ১৩ কেজি ৯০০ গ্রাম গাঁজা, ১১ হাজার ৮৬ পিস ইয়াবা এবং ৫৫৬ গ্রাম হেরোইন।
সম্প্রতি জামিনে বের হওয়া বেশ কয়েকজন আসামি রূপালী বাংলাদেশকে জানান, মাদক মামলার আসামিরা একে অপরের ভালো বন্ধু। কারাগারে তাদের কাছে সরাসরি মাদক পৌঁছে দিতেন কারারক্ষী ও কারা পুলিশের সদস্যরা। বাবু নামের সদ্য কারাগার থেকে বের হওয়া এক আসামি জানান, কারারক্ষীরা কারাগারে মাদক পৌঁছে দেন। জেলে শুধু মাদক নয়, হাত বাড়ালে এবং টাকার বিনিময়ে যা ইচ্ছে তাই পাওয়া যায়।
যারা রক্ষক তারাই ভক্ষক, কারারক্ষীদের কাউনসেলিং প্রয়োজন : এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক আইজিপি রূপালী বাংলাদেশকে জানান, যারা রক্ষক তারাই ভক্ষক। যারা প্রতিরোধ করবে, তাদের সহায়তায় যদি মাদকের বিস্তার হয়, প্রসার হয় ও ব্যবসা হয়, সেটি খুবই দুঃখজনক। যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তবে কর্তৃপক্ষকে আরও নজরদারি বাড়াতে হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, এটা ভালো লক্ষণ যে তাদের ছাড় দেওয়া হয়নি। তাদের কাউনসেলিং প্রয়োজন বলে জানান সাবেক এই আইজিপি। তিনি জানান, তাদের বোঝাতে হবে, এই অপরাধ করায় তাদের চাকরি চলে যাচ্ছে, দেশ ও রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে। তাই তাদের এ কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকতে হবে।
স্ত্রী প্রতি মাসে টাকা পাঠাত, সেই টাকা দিয়ে ভেতরে চাহিদামতো মাদক পেতাম :
গত বছরের ৮ ডিসেম্বর কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিন পাওয়া মাদক কারবারি নয়ন বলেন, ‘আমি কাশিমপুর মনিহার-২-এ ছিলাম। সেখানে আমার স্ত্রী প্রতি মাসে টাকা পাঠাত, সেই টাকা দিয়ে ভেতরে ম্যানেজ করে আমি চাহিদামতো মাদক পেতাম। এর মধ্যে কিছু টাকা কারারক্ষীরা মেরে দিয়েছেন। তাদের বিকাশ নম্বরে টাকা আনতাম।’ তিনি বলেন, কারাগার যেন মাদকের হাট।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন মুগদাপাড়া এলাকার মাদক কারবারি জনি ওরফে কাটা জনি। তার স্ত্রী আলেয়া রোজি বলেন, ‘আমার স্বামী ইয়াবা সেবন করত সেটা আমি জানতাম। তাকে খাওয়ানোর জন্য এবং মাদক সেবনের জন্য প্রতি মাসে এক কারারক্ষীর নম্বরে বিকাশে টাকা পাঠাতাম।’
উচ্চ দরে বন্দি মাদকসেবীর কাছে বিক্রি করা হয় : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কারা ফটকে তল্লাশিতে যে পরিমাণ মাদক ধরা পড়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি নানা কৌশলে ভেতরে ঢুকে যায়। সেগুলো উচ্চ দরে বন্দি মাদকসেবীর কাছে বিক্রি করা হয়। টাকা দিলে কারাগারে সবই মেলে, সেই হিসাবে মাদক বরং সহজলভ্য বলা যায়। কারারক্ষীর সহায়তায় সহজেই বন্দিরা চাহিদামতো মাদক পেয়ে যান।
মাদকের ক্ষেত্রে দেখানো হয় সর্বোচ্চ কঠোরতা : কারা কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকের ক্ষেত্রে দেখানো হয় সর্বোচ্চ কঠোরতা। মাদকসংশ্লিষ্টতার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ ছাড়া অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী দু-তিন বছর বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, পদোন্নতি স্থগিত, সতর্ক ও তিরস্কার করার মতো সাজা দেওয়া হয়। দুই বছরে মাদক বহন ও সেবনের কারণে ৩ হাজার ৫৬০ জনকে সাজা দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। তাদের কাছে পাওয়া যায় ১১ কেজির বেশি গাঁজা, প্রায় সাড়ে ৯ হাজার ইয়াবা, ২৯১ গ্রাম হেরোইন ও ৫৩৭ পিস ডিসোপ্যান-২ ট্যাবলেট। এসব ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে বড় সাজা হিসেবে আরেকটি ফৌজদারি মামলা করা হয়। এ ছাড়া ডিভিশন পাওয়া বন্দি হলে ডিভিশন বাতিল করা হয়।
কারাগার নিয়ে সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক কারবারিরা বিভিন্ন কৌশলে মাদকদ্রব্য কারাগারে পৌঁছে দেয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, লুঙ্গি, শার্টের কলারে, জুতার ভেতরে বা খাবারের সঙ্গে এমনকি গলায় ঝোলানো তাবিজেও মাদক সরবরাহ করা হয়। এ কারণে কতিপয় দুর্নীতিবাজ কারা কর্মকর্তা ও কারারক্ষীর মধ্যে প্রায় ৪৫০ জনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কারাগারেও মাদক সিন্ডিকেটে জড়িত কারারক্ষীরা। তারা অপরাধীদের সঙ্গী হয়ে অপরাধে যুক্ত হচ্ছেন। তাদের নিয়মিত সেমিনার ও বিভিন্ন কাউনসেলিং করা উচিত।
কারা অধিদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. জান্নাত উল ফরহাদ রূপালী বাংলাদেশকে জানান, দেশের কারাগারগুলোতে বন্দিদের ৪০ শতাংশই হলো মাদকসংক্রান্ত মামলার আসামি। এর মধ্যে কেউ ব্যবসায়ী, কেউ বহনকারী, আবার কেউ সেবনকারী। মূলত এসব আসামি যখন মামলার হাজিরার কারণে আদালতে নেওয়া হয়, সেখান থেকে ফেরত আসার সময় তারা কৌশলে মাদক নিয়ে প্রবেশ করে। এ ছাড়া বন্দিদের দেখতে আসা দর্শনারীদের মাধ্যমে কারাগারে মাদক আসে। ৯০ শতাংশ মাদক কারাগারে আসা আসামিদের মাধ্যমে আসে। ১০ শতাংশ মাদক কারাগারের কর্মকর্তা, কারারক্ষী এবং কর্মচারীদের মাধ্যমেও আসে এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। গত দুই বছরে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৯৯৬ জন কারা কর্মকর্তা, কারারক্ষী ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে কারা অধিদপ্তর।
তিনি আরও জানান, দেশের কারাগারগুলোতে যাতে কোনোভাবে মাদকসহ কোনো ধরনের অবৈধ কিছু নিয়ে কেউ প্রবেশ করতে না পারে, এ জন্য স্ক্যানিং মেশিন বসানো আছে। তবে অধিকাংশ মেশিন পুরোনো হয়ে গেছে। এ ছাড়া এসব মেশিন পরিচালনা করার জন্য যে জনবল প্রয়োজন, সেই জনবলের সংকট রয়েছে কারাগারগুলোতে। এসব মেশিন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন, সেই অর্থ বরাদ্দ নেই। তবে কাশিমপুরসহ হাইসিকিউরিটি কারগারগুলোতে নতুন মেশিন বসানো হয়েছে। যাদে মাদকসহ কোনো অবৈধ জিনিস কারাগারে প্রবেশ করতে না পারে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের কারাগারগুলোতে সার্বিক নজরদারি রাখার জন্য ২৭টি ট্রাস্কফোর্স টিম কাজ করছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি জড়িতদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে কারা অধিদপ্তর জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত সে যে-ই হোক, কারাগারের কর্মকর্তা-কর্মচারী অথবা বিভিন্ন বন্দিÑ সবার বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলা করা হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন