× UCB Sticker Card
শনিবার, ০৪ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মো. তাহমিদ রহমান, শিক্ষক, গবেষক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৬, ০৬:২৯ এএম

দূষণের দায় যাদের, ক্ষতিপূরণেও অনীহা তাদের

মো. তাহমিদ রহমান, শিক্ষক, গবেষক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৬, ০৬:২৯ এএম

দূষণের দায় যাদের, ক্ষতিপূরণেও অনীহা তাদের

জাতিসংঘের জলবায়ু সংক্রান্ত বার্ষিক সম্মেলন সাধারণত প্রতি বছরই অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের এই সম্মেলনকে বলে কপ (ঈঙচ) বা কনফারেন্স অফ পার্টিজ। পরবর্তী বার্ষিক সম্মেলন কপ-৩১ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৯ নভেম্বর থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তলিয়ায়। গত বছর ব্রাজিলের বেলেম-এ অনুষ্ঠিত হয়েছে কপ-৩০। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রস্তুতি ও অঙ্গীকারকে আরও সুসংহত করার লক্ষ্য নিয়ে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন বা ইউএনএফসিসির সাবসিডিয়ারি বডির ৬৪তম অধিবেশন (এসবি-৬৪) সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে জার্মানির বন শহরে। ৮ থেকে ১৮ জুন ২০২৬ এগারো দিনব্যাপী জাতিসংঘের জলবায়ু সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী এই সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় সব দেশের সরকারি প্রতিনিধি, বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, নাগরিক সমাজের সদস্য এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, দাবানল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন বৈশ্বিক সহযোগিতার অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী কপ সম্মেলনের আলোচনা ও অগ্রগতি পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আবারও প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের মূল দর্শন হলোÑ যেসব দেশ শিল্পায়নের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সর্বাধিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেছে, তাদেরই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় বেশি দায়িত্ব নিতে হবে।

অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনো পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পরবর্তী কপের প্রস্তুতির প্রথাগত আলোচনার বাইরেও বন-এ এবার কয়েকটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক এবং সম্পর্ক উন্নয়ন ও প্রাপ্তির রশি টানাপোড়েন স্পষ্টত হয়েছে। এই টানাপোড়েন হয়েছে মূলত উন্নত এবং উন্নতিশীল দেশগুলোর মধ্যে। বিশেষত উন্নত দেশগুলো কিছুতেই তাদের সম্মতিকৃত অর্থ দিতে চাইছে না। চাইছে আগের বেলেম সম্মেলনে গৃহীত অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ যাতে কমে। ইউনাইটেড নেশন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ বা ইউএনএফসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাইমন স্টিল উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে আগের বৈঠকের গৃহীত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা থেকে কেন উন্নত দেশগুলো পেছিয়ে আসছে। কপের মধ্যবর্তী সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরবর্তী কপ সম্মেলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রস্তুতি নেওয়া, আগের সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করা এবং জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে অগ্রগতি নিশ্চিত করা।

কিন্তু বাস্তবে মধ্যবর্তী এই সম্মেলনের ক্রমশ দীর্ঘ বক্তৃতা, কূটনৈতিক ভাষণ এবং রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। উন্নয়নশীল ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জরুরি দাবি বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডগঙ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। অন্যদিকে আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেলের (ওচঈঈ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান নিঃসরণ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর মধ্যেই বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে, যা মানবসভ্যতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রেও উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি প্রশ্নবিদ্ধ।

বর্তমানে নতুন জলবায়ু অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আলোচনা চললেও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর দাবি অনুযায়ী প্রকৃত প্রয়োজন বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বাস্তবে ঘোষিত অর্থের বড় অংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়, যা দরিদ্র দেশগুলোর ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, শিল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ বা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি দায়ী উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে ব্যাপক কার্বন নিঃসরণ করে তারা উন্নয়নের উচ্চতায় পৌঁছেছে। অথচ সেই উন্নয়নের মূল্য আজ দিচ্ছে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র এবং আফ্রিকার বহু দরিদ্র দেশ। ন্যায্যতার বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা উন্নত দেশগুলোর নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বহু বছর ধরেই উন্নত দেশগুলো বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণেও তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষতিপূরণ তহবিলের অর্থ কোথা থেকে আসবে, কে দেবে, কীভাবে বিতরণ হবে এসব প্রশ্নে অবিরাম আলোচনা ও কালক্ষেপণ। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো প্রতিনিয়ত দুর্যোগের ক্ষতি সামাল দিতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি বহন করছে এ উপসাগরীয় বদ্বীপ ভূমি। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে বিপুল ক্ষতি হচ্ছে।

অথচ আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছেনি। মধ্যবর্তী কপ বৈঠকগুলোতে এই বাস্তবতা তুলে ধরা হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর অনীহা স্পষ্ট। তারা প্রায়ই আর্থিক দায়বদ্ধতা এড়াতে নানা শর্ত, কারিগরি ব্যাখ্যা এবং প্রশাসনিক জটিলতার আশ্রয় নেয়। ফলে আলোচনার পর আলোচনা হলেও বাস্তব পরিবর্তন ঘটে না। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতির প্রতি আস্থাও হ্রাস পাচ্ছে। জলবায়ু সংকট কোনো দেশের একক সমস্যা নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাই কপ সম্মেলনকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের গ-ি থেকে বের করে বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হবে। প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন বাস্তব অর্থায়ন; আলোচনা নয়, প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। শিল্পোন্নত দেশগুলোর উচিত ক্ষতিপূরণ তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ প্রদান এবং তা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে অভিযোজন প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তুলতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর জরুরি। জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এসবি-৬৪ সম্মেলন কোনো বড় রাজনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরের সম্মেলন না হলেও এটি বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখানে গৃহীত আলোচনা, সুপারিশ এবং খসড়া সিদ্ধান্তগুলো আগামী কপ-৩১ সম্মেলনের আলোচ্যসূচি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বন সম্মেলন স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের সামনে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাই এখন আর কেবল প্রতিশ্রুতি নয় বরং মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ রক্ষা করাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!