শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ফটকের সামনেই ময়লার ডাস্টবিনÑ দৃশ্যটি যেকোনো সচেতন নাগরিকের কাছেই চরম অবমাননাকর। কিন্তু শেরপুর শহরের নয়আনী বাজার এলাকার ‘বাগড়ী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর ক্ষেত্রে চিত্রটি কেবল অবমাননাকর নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের জীবনের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের অদূরেই স্থাপিত একটি বড় ময়লার ডাস্টবিন প্রতিদিন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ছয় শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন বিদ্যালয়ের ফটক দিয়েই শত শত শিক্ষার্থী প্রাণোচ্ছলভাবে আসা-যাওয়া করে। কিন্তু ফটকের ঠিক পাশেই রাখা ডাস্টবিনটি প্রায় সবসময় উপচেপড়া ময়লায় পূর্ণ থাকে। গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে শুরু করে বাজারের পচনশীল ময়লা এখানে ফেলা হয়, যা থেকে প্রতিনিয়ত উৎকট দুর্গন্ধ ছড়ায়। বিশেষ করে রোদ বাড়লে এই দুর্গন্ধ আরও তীব্র আকার ধারণ করে, যা বাতাসে মিশে পুরো এলাকাকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলেছে। ডাস্টবিনের আশপাশের পরিবেশ এতটাই অস্বাস্থ্যকর যে, শিক্ষার্থীরা নাকে রুমাল চেপে স্কুলে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ডাস্টবিন ঘিরে মাছি, মশা এবং বিভিন্ন ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের বংশবিস্তার ঘটছে। আবার ময়লার স্তূপের পাশে দাঁড়িয়েই একজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা শিক্ষার্থীদের কাছে খোলা খাবার বিক্রি করছেন।
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্র বলে, স্কুলে আসার সময় গেটের কাছে পৌঁছালেই ডাস্টবিনের গন্ধে আমাদের বমি আসে। অনেক সময় পেট ব্যথা করে। এই গন্ধে ক্লাসের ভেতরে ঠিকমতো মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করা যায় না। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী জানায়, ডাস্টবিনের ময়লাগুলো পচে পানি হয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ে, সেই ময়লা মাড়িয়ে আমাদের স্কুলে ঢুকতে হয়। জামাকাপড়েও গন্ধ লেগে থাকে, বন্ধুদের সামনে খুব লজ্জা পাই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খোলা খাবারের ওপর মশা-মাছির মাধ্যমে জীবাণু ছড়িয়ে শিক্ষার্থীরা কলেরা, ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, ডাস্টবিনটি এখান থেকে না সরানোর ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ও শারীরিক নিরাপত্তা উভয়ই হুমকির মুখে পড়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হাজেরা আক্তার বলেন, ‘আমাদের এখানে ছয় শতাধিক শিশু পড়াশোনা করে। কোমলমতি এই শিশুদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা করে ডাস্টবিনটি এখান থেকে সরানোর জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছি। দুর্গন্ধের কারণে শ্রেণিকক্ষে বসে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করাও অনেক সময় দুরূহ হয়ে পড়ে। আমি ব্যক্তিগতভাবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার (ডিপিও) মাধ্যমে পৌরসভা ও জেলা প্রশাসকের বরাবর আবেদন করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের এই আবেদনগুলো এখনো ফাইলবন্দি হয়ে আছে, কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পৌরসভা সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং নজরদারির অভাবেই শিক্ষাঙ্গনের মতো স্পর্শকাতর স্থানে ময়লা ফেলার এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শহর পরিষ্কার রাখা পৌরসভার দায়িত্ব, কিন্তু তা করতে গিয়ে শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে ময়লার ভাগাড় তৈরি করা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়। তারা বলছেন, দ্রুত ডাস্টবিনটি অন্যত্র স্থানান্তর না করলে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকটে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেরপুর পৌরসভার প্রশাসক আরিফা সিদ্দিকা বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকির বিষয়টি আমি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। স্কুলের ফটকের সামনে ময়লার ডাস্টবিন থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলেছি এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত সাপেক্ষে ডাস্টবিনটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন