চলতি ফিফা বিশ্বকাপের তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষায় আছেন নরওয়ে ও ইংল্যান্ডের লড়াই দেখার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ৩টায় মুখোমুখি হবে নরওয়ে ও ইংল্যান্ড। এই ম্যাচের আগে কাগজে-কলমে ইংল্যান্ডকে ফেভারিট ধরা হলেও এবারের বিশ্বকাপে নরওয়ে প্রমাণ করেছে, তারা শুধু টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করতে আসেনিÑ বরং ইতিহাস গড়তে এসেছে। ফলে ম্যাচটি শুধু শেষ চারের টিকিটের লড়াই নয়, বরং ইউরোপীয় ফুটবলের দুই ভিন্ন দর্শন ও দুই প্রজন্মের তারকাদের লড়াইও।
ইংল্যান্ডের লক্ষ্য ১৯৬৬ সালের পর আবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা। অন্যদিকে নরওয়ে চাইছে, বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের সেরা সাফল্যের নতুন অধ্যায় লিখতে।
নরওয়ের দুর্দান্ত উত্থান : বিশ্বকাপ আসরে অংশগ্রহণের আগে নরওয়েকে খুব কম মানুষই সম্ভাব্য শিরোপাপ্রত্যাশী হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্স সব হিসাব বদলে দিয়েছে। গ্রুপ পর্বে আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলে নকআউট নিশ্চিত করার পর শেষ ষোলোতে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয় তারা। সেই ম্যাচে দুই গোল করে নায়ক বনে যান এরলিং হালান্ড। তার শক্তি, গতি ও নিখুঁত ফিনিশিং ব্রাজিলের রক্ষণকে বারবার ভেঙে দেয়।
শুধু হালান্ডই নন, অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড টুর্নামেন্টজুড়ে দলের আক্রমণ সাজানোর মূল কারিগর। তার সঙ্গে মিডফিল্ড ও ডিফেন্সের সমন্বয় নরওয়েকে ভারসাম্যপূর্ণ দলে পরিণত করেছে। দ্রুত পাল্টা আক্রমণ, শারীরিক সক্ষমতা এবং সংগঠিত রক্ষণ এখন তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ইংল্যান্ডের নতুন যুগের সূচনা : নতুন কোচ টমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ড আরও কৌশলী ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে। গ্রুপ পর্বের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পর শেষ ষোলোতে স্বাগতিক মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে তারা। অধিনায়ক হ্যারি কেইন বড় ম্যাচে নিজের অভিজ্ঞতার প্রমাণ দিয়েছেন। জুড বেলিংহ্যাম মাঝমাঠে দারুণ ছন্দে আছেন। বুকায়ো সাকার গতি, ফিল ফোডেনের সৃজনশীলতা এবং ডেকলান রাইসের রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা ইংল্যান্ডকে ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে গড়ে তুলেছে। তবে ইংল্যান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে নরওয়ের দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক সামলানো। রক্ষণের সামান্য ভুল বদলে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য।
হালান্ড বনাম কেইন : বিশ্বকাপের এই কোয়ার্টার ফাইনালের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে এরলিং হালান্ড ও হ্যারি কেইনের মুখোমুখি লড়াই। হালান্ড আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকারদের একজন। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের সঙ্গে শারীরিক লড়াই, বক্সে সঠিক অবস্থান নেওয়া এবং ক্ষুদ্র সুযোগকে গোলে পরিণত করার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে আলাদা করেছে। অন্যদিকে কেইন কেবল গোলদাতা নন, তিনি একজন প্লেমেকারও। প্রয়োজনে নিচে নেমে বল জুগিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলেন, আবার সুযোগ পেলেই নিখুঁত ফিনিশিংয়ে প্রতিপক্ষকে শাস্তি দেন। বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা ইংল্যান্ডের জন্য বড় সম্পদ।
মাঝমাঠেই নির্ধারিত হতে পারে ভাগ্য : এই ম্যাচের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হবে মার্টিন ওডেগার্ড ও জুড বেলিংহ্যামের মধ্যে। ওডেগার্ড বলের দখল ধরে রেখে আক্রমণ গড়তে পারদর্শী। তার দূরদর্শী পাস নরওয়ের ফরোয়ার্ডদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে বেলিংহ্যাম পুরো মাঠজুড়ে সক্রিয় থাকেন। রক্ষণ, মাঝমাঠ ও আক্রমণÑ সব জায়গাতেই সমান কার্যকর তিনি। তার শক্তি ও গতি ইংল্যান্ডকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
কৌশলের লড়াই : নরওয়ে সম্ভবত ৪-৩-৩ ছকে খেলবে। তাদের পরিকল্পনা থাকবে রক্ষণ শক্ত রেখে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ইংল্যান্ডকে চাপে ফেলা। ইংল্যান্ড বলের দখল ধরে রেখে ধৈর্য নিয়ে আক্রমণ গড়তে চাইবে। দুই প্রান্ত দিয়ে সাকা ও ফোডেনের গতি কাজে লাগিয়ে সুযোগ তৈরির চেষ্টা করবে তারা। মাঝমাঠে রাইস ও বেলিংহ্যামের সমন্বয় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এনে দিতে পারে।
চলতি বিশ্বকাপে দুই দলের পারফরম্যান্স : নরওয়ে এখন পর্যন্ত আইভরি কোস্ট ও ব্রাজিলকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে এসেছে। বিশেষ করে ব্রাজিলের বিপক্ষে জয় তাদের আত্মবিশ্বাসকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড নকআউট পর্বে ডিআর কঙ্গো এবং পরে মেক্সিকোকে হারিয়ে শেষ আটে উঠেছে। বড় ম্যাচে চাপ সামলে জয় তুলে নেওয়ার সক্ষমতা তারা দেখিয়েছে। দুই দলই এখন পর্যন্ত আক্রমণ ও রক্ষণÑ দুই বিভাগেই ভারসাম্যপূর্ণ পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছে।
মুখোমুখি পরিসংখ্যান : নরওয়ে ও ইংল্যান্ড আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১২ বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ইংল্যান্ড জিতেছে ৭টি ম্যাচ। বিপরীতে নরওয়ের জয় দুই ম্যাচে। অমীমাংসিত ৩টি ম্যাচ।
এই পরিসংখ্যান ইংল্যান্ডের পক্ষে থাকলেও বর্তমান ফর্ম ও আত্মবিশ্বাসের বিচারে ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছে।
ম্যাচের পার্থক্য গড়া ফুটবলার : নরওয়ের জন্য এরলিং হালান্ড, মার্টিন ওডেগার্ড ও আলেকজান্ডার সোরলোথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের জন্য হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহ্যাম, বুকায়ো সাকা, ফিল ফোডেন ও ডেকলান রাইসের পারফরম্যান্স নির্ধারণ করতে পারে ম্যাচের ফল।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ভুলের সুযোগ নেই। একটি মুহূর্ত, একটি গোল কিংবা একটি রক্ষণভাগের ভুলই নির্ধারণ করে দিতে পারে পুরো টুর্নামেন্টের ভবিষ্যৎ। নরওয়ে যদি তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল ধরে রাখতে পারে, তবে আরেকটি অঘটন ঘটানো অসম্ভব নয়। তবে ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞতা, বেঞ্চের গভীরতা এবং বড় ম্যাচ খেলার মানসিকতা তাদের কিছুটা এগিয়ে রেখেছে।
সব মিলিয়ে নরওয়ে-ইংল্যান্ড ম্যাচটি হতে যাচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা কোয়ার্টার ফাইনাল। একদিকে হালান্ডের গোলের ক্ষুধা, অন্যদিকে কেইনের নেতৃত্বÑ এই দ্বৈরথে বিজয়ী দলই পা রাখবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন