বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিছু ম্যাচ থাকে, যেগুলোর গুরুত্ব ৯০ মিনিটের ফলাফলের চেয়েও অনেক বেশি। সেই ম্যাচগুলো ভবিষ্যতের ফুটবলকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে, বদলে দেয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এবং নতুন নায়কের জন্ম দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ফ্রান্সের ২-০ গোলের হার ছিল ঠিক তেমনই একটি ম্যাচ।
স্কোরলাইন বলছে স্পেন ফাইনালে উঠেছে এবং সেটা দীর্ঘ ১৬ বছর পর। কিন্তু পরিসংখ্যানের বাইরে এই ম্যাচের আসল গল্প ছিল দুই তারকাকে ঘিরেÑ একজন বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পে, অন্যজন নতুন প্রজন্মের বিস্ময়কর প্রতিভা লামিন ইয়ামাল। একজন ম্যাচজুড়ে ছিলেন নীরব, অন্যজন ছিলেন প্রতিটি আক্রমণের প্রাণ। একজন নিজের সামর্থ্য অনুসারে জ¦লে উঠতে পারেননি; অন্যজন আরও একবার প্রমাণ করেছেন, বড় ম্যাচের আলোয় তিনি ভীত নন। তবে এই ম্যাচকে ‘এমবাপ্পের শেষ’ বা ‘ইয়ামালের শুরু’ বলে সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। বরং এটি এমন একটি সন্ধ্যা, যা বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে কোন দিকে ঝুঁকছে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী।
থামলেন অপ্রতিরোধ্য এমবাপ্পে : মাত্র ১৯ বছর বয়সে ২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী দলের গর্বিত সদস্য। এরপর ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিক গোল, গতি আর বিস্ফোরক পারফরম্যান্সÑ সব মিলিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে গত এক দশকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী নাম। তাকে থামানোই ছিল একটি দলের সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ তিনি শুধু গোল করেন না, এক মুহূর্তে ম্যাচের গতিও বদলে দেন। তার গতির সঙ্গে তাল মেলানো ডিফেন্ডারের সংখ্যা হাতেগোনা। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে সেই ভয়ংকর এমবাপ্পেকে যেন দেখা গেল না। তিনি বল পেলেই চারপাশে তৈরি হয়েছে লাল জার্সির দেয়াল। উইং দিয়ে দৌড় শুরু করার আগেই তাকে চেপে ধরা হয়েছে। মাঝমাঠ থেকে পর্যাপ্ত সাপোর্ট না পাওয়ায় বারবার নিচে নেমে বল নিতে হয়েছে। ফলে প্রতিপক্ষের বক্সে তার উপস্থিতি কমে গেছে।
এটি ছিল এমন এক ম্যাচ, যেখানে এমবাপ্পে যতটা নিজের ব্যর্থতার কারণে থেমেছেন, তার চেয়েও বেশি থেমেছেন স্পেনের নিখুঁত পরিকল্পনার কারণে।
কৌশলী স্পেন : আধুনিক ফুটবলে বড় তারকাদের থামাতে শুধু একজন ডিফেন্ডার যথেষ্ট নন, দরকার পুরো দলের সমন্বিত রক্ষণ। স্পেন সেটিই করেছে সেমিফাইনালে। এমবাপ্পে বল পেলেই কাছাকাছি থাকা দুই ডিফেন্ডার তাকে ঘিরে ফেলেছেন, আর পেছন থেকে আরেকজন কভার দিয়েছেন। ফলে তিনি কখনোই ফাঁকা জায়গা পাননি। সুযোগ সৃষ্টি হয়নি গতি কাজে লাগানোর। এটিই ছিল স্পেনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তারা এমবাপ্পেকে শুধু গোল করতে দেয়নি তা নয়, গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে ছন্দেও ফিরতে দেয়নি।
বড় ম্যাচে বাজির ঘোড়া ইয়ামাল : ফুটবলপ্রেমীরা লামিন ইয়ামালের প্রতিভা অনেক আগেই দেখেছেন। কিন্তু প্রতিভাবান হওয়া আর বড় ম্যাচের বাজির ঘোড়া হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। ফ্রান্সের বিপক্ষে ইয়ামাল দেখালেন, তিনি শুধু ভবিষ্যতের তারকা নন; বর্তমানেরও অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফুটবলার। ডান প্রান্তে তার গতি, ড্রিবলিং এবং আত্মবিশ্বাস ফ্রান্সের রক্ষণকে বারবার ভেঙে দিয়েছে। প্রথম গোলের সূচনায় তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবার বল পায়ে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা দলের আক্রমণকে আরও কার্যকর করেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তিনি অযথা ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দেখানোর চেষ্টা করেননি। কখন পাস দিতে হবে, কখন গতি বাড়াতে হবে, আর কখন খেলা ধীর করতে হবেÑ এসব সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হয়নি তার।
মাঝমাঠেই পরাজিত ফ্রান্স : যে দল মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেই দলই থাকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রক। ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে স্পেন ঠিক সেটাই করেছে। ছোট ছোট পাস, দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন, বল হারানোর পর সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিংÑ এসব কৌশলে ফ্রান্সকে কখনোই স্বস্তিতে খেলতে দেয়নি তারা। ফ্রান্সের মাঝমাঠ বারবার বল হারিয়েছে। আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। এমবাপ্পে একা হয়ে পড়েছেন। ফলে ফরাসি আক্রমণ ভেঙে পড়েছে।
এটি কি সত্যিই প্রজন্ম বদলের মুহূর্ত : ফুটবল ইতিহাসে এমন মুহূর্ত নতুন নয়। পেলের পর এসেছেন ম্যারাডোনা। ম্যারাডোনার পর জিদান। এরপর মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো প্রায় দেড় দশক বিশ্ব ফুটবল শাসন করেছেন। এখন প্রশ্ন উঠছে, পরবর্তী যুগের মুখ কি ইয়ামাল? সে সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে। কারণ বড় ফুটবলার হতে হলে শুধু প্রতিভা নয়, ধারাবাহিকতা, ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা এবং দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করতে হয়। তবে এটুকু নিশ্চিত, ইয়ামাল এরই মধ্যে দেখিয়েছেন তিনি বড় মঞ্চের চাপ সামলাতে সক্ষম। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে বিশ্বকাপÑ সব জায়গাতেই তার প্রভাব স্পষ্ট।
এমবাপ্পের সামনে যে চ্যালেঞ্জ : মহান খেলোয়াড়দের পরিচয় শুধু সাফল্যে নয়, ব্যর্থতা থেকে ফিরে আসার ক্ষমতায়। স্পেনের বিপক্ষে সেমিফাইনাল এমবাপ্পের জন্য ছিল এক কঠিন শিক্ষা। প্রতিপক্ষ যখন তাকে বিশেষ পরিকল্পনায় আটকে দেয়, তখন কীভাবে ম্যাচে প্রভাব ফেলতে হবে, সেটিই হবে তার পরবর্তী উন্নতির জায়গা। তিনি এখনো ক্যারিয়ারের এমন পর্যায়ে আছেন, যেখানে আরো অনেক বড় ম্যাচ জেতার সুযোগ রয়েছে। তাই একটি ম্যাচ দিয়ে তার অধ্যায় শেষ হয়ে যায় না।
সোনার কাপের অপেক্ষায় স্পেন : স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের দলগত ভারসাম্য। তারা কোনো একজন তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। ইয়ামাল, ওইয়ারসাবাল, পেদ্রো পোরো, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রকরা এবং রক্ষণভাগÑ সবাই নিজ নিজ ভূমিকা পালন করছে। এ কারণেই স্পেন এখন শুধু ফাইনালিস্ট নয়, শিরোপার অন্যতম দাবিদারও।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন