দেশে-বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে বিদেশ ভ্রমণ, অনলাইন কেনাকাটা, আন্তর্জাতিক সেবাগ্রহণ এবং ক্যাশলেস লেনদেনের প্রবণতা বাড়ার কারণে গত কয়েক বছরে ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে দেশে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বাইরে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মোট ৪২৫ কোটি টাকা খরচ করেছেন। এর মধ্যে শুধু ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা বিপণিবিতানেই ব্যয় হয়েছে ১৫৯ কোটি টাকা, যা বিদেশে মোট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ। এদিকে দীর্ঘ সময় পিছিয়ে থাকা ভারতে বাড়ছে বাংলাদেশি ডেবিট কার্ডের ব্যবহার। যদিও ক্রেডিট কার্ডে এখনো শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রিপেইড কার্ডে বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি খরচ করেন সৌদি আরবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে ভ্রমণ, শপিং ও ব্যক্তিগত কেনাকাটার প্রবণতা বাড়ার কারণে এই খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এপ্রিল মাসে দেশে অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট কার্ড লেনদেন ছিল ৩ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা, যা মে মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। একইভাবে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে ব্যয় এপ্রিলে ৪২৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা থেকে মে মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা বড় বিপণিবিতানে। মে মাসে এই খাতে ব্যয় হয়েছে ১৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। বিদেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে খুচরা পণ্যসেবা খাতে। এই খাতে ব্যয় হয়েছে ৭২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ ছাড়া পরিবহন খাতে ৫২ কোটি ২০ লাখ টাকা খরচ করেছেন বাংলাদেশিরা। এর মধ্যে বিমান টিকিট, রাইড শেয়ারিং, গণপরিবহন ও ট্রাভেল সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের পেশাগত সেবায় ব্যয় হয়েছে ৩৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বিদেশে পোশাক খাতে খরচ হয়েছে ২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ওষুধ ও ফার্মেসি খাতে বিদেশে ব্যয় হয়েছে ৪২ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
তথ্য বলছে, দেশভিত্তিক হিসাবেও যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেছেন বাংলাদেশিরা। মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে ৭২ কোটি টাকা। উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা, ভ্রমণ ও কেনাকাটার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের ব্যয় বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। এর পরই রয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটিতে বাংলাদেশিদের ব্যয় হয়েছে ৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড। দেশটিতে বাংলাদেশিদের ব্যয় হয়েছে ৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। চিকিৎসা ও পর্যটন ব্যয় বাড়ার কারণে থাইল্যান্ডে কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরে ৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, সৌদি আরবে ৩১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ভারতে ২৯ কোটি ২১ লাখ টাকা, মালয়েশিয়ায় ২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা, নেদারল্যান্ডসে ২০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, চীনে ১৭ কোটি ১০ লাখ টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং আয়ারল্যান্ডে ১৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছেন বাংলাদেশিরা।
এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ লেনদেনেও সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। মে মাসে এই খাতে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৬৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সুপারশপ, বড় বিপণিবিতান ও চেইন রিটেইল স্টোরে নগদবিহীন কেনাকাটা বাড়ার কারণে এই খাতে লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ব্যয় হয়েছে ৪৮৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৩৬৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া নগদ অর্থ উত্তোলনে ২৯৯ কোটি, সরকারি সেবায় ২৬২ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ওষুধ ও ফার্মেসিতে ২৩২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তথ্য বলছে, দেশে ও বিদেশে উভয় ক্ষেত্রেই ভিসা কার্ডের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। মে মাসে দেশের ভেতরে ভিসা কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ২৩৮ কোটি ৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে মাস্টার কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে ৬৬৬ কোটি টাকা। সিটি এমএক্স কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৩৬৮ কোটি টাকা। ব্যাংকাররা বলছেন, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সহজ ব্যবহারের কারণে ভিসা কার্ডের ব্যবহার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের ৪৭টি ব্যাংক এবং একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে। বর্তমানে বাজারে মোট ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ২৭ লাখ ৪২ হাজার ৪৯।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন